শুক্রবার, ১২ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

সব

Singapore
Corona Update

Confirmed Recovered Death
59,879 59,746 29

Bangladesh
Corona Update

Confirmed Recovered Death
543,717 492,059 8,356

স্বাধীনতা

ছোট গল্প | ০১ আগস্ট ২০২২ | ৮:২৩ অপরাহ্ণ
স্বাধীনতা

বাবুপাড়ার চার নম্বর গলিতে কেউ সচরাচর যেতে চায় না। কেউ বলতে ভদ্রলোক। কারণ এখানে যারা থাকে তাদের একটাই পরিচয়। তারা বেশ্যা। সমাজ যাদের প্রায় এক ঘরে করে রেখেছে। আবার কত বাবু, মুখোশধারী ভদ্রলোক টাকার বিনিময়ে তাদের কাছে এসে শরীরের ক্ষিদে মেটায়, কাম চরিতার্থ করে। এক কথায় এটা নিষিদ্ধ পল্লী। আর বিজলি, মহুয়া, শ্যামা, ময়না এরা সবাই ওই নিষিদ্ধ পল্লীতে থাকে। বিকেল হতে না হতেই উগ্র সাজগোজ করে, কিছুটা বক্ষ, পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা পোশাক পরে এরা দাঁড়িয়ে থাকে বাবু ধরতে। তবে এদেরও মন আছে। আছে ভালোবাসা আর আছে স্বপ্ন দেখার অধিকার।
ওই যে নিষিদ্ধ পল্লীর ময়না ওরও একটা অতীত আছে। একবার এক স্বাধীনতা দিবসের দিন পাড়ার এক কাকুর হাত ধরে ঘর ছাড়া হয়। অভাবের সংসার; একবেলা খাবার জোটে তো অন্য বেলা উপোস দিতে হয়। সেই কাকুই ময়নাকে স্বপ্ন দেখায় চাকরি করার; নিজের পায়ে দাঁড়ানোর; আর সেই কথায় ভরসা করেই তার সাথে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। তবে যাকে সে এতটা বিশ্বাস করল সেই লোকটাই ওকে বিক্রি করে দিল। ঘরে ফেরার রাস্তাটুকুও চিরদিনের মতো বন্ধ করে দিল। আর তাই ও আজও ভাবে স্বাধীনতা দিবস আসে, যায়। দেশ স্বাধীন। মানুষ স্বাধীন। কিন্তু ও তো চিরতরেই পরাধীন হয়ে গেল।
— কি রে ময়না চুপ করে বসে আছিস যে? আ যাবি না? হুঁশ ফিরে শ্যামার ডাকে।
— হঁ্যা যেতে তো হবেই। তবে দ্যাখ না। মেয়েটার কাল থেকে বড্ড জ্বর। যেতে মন চাইছে না রে। কি করি বলতো?
— তুই যা, আমি আছি ওর কাছে।
— তুই যাবি না আজ?
— না রে আজ আমার ছুটি। মাসের ওই চারটে দিনই তো আমাদের ছুটি। আমরা স্বাধীনভাবে একটু থাকতে পারি। বাকি দিনগুলো তো আমাদের বন্দী জীবন।
— তা যা বলেছিস। ঠিক আছে, তুই থাক তবে শিউলির পাশে।
শিউলি ময়নার মেয়ে, যদিও ওর কোন পিতৃপরিচয় নেই। তবে এই ছয় বছরের শিউলিকে নিয়েই ওর জীবন। ময়না চায় মেয়েকে লেখাপড়া শেখাতে, নিজের পায়ে দাঁড় করাতে। কিন্তু ও এটাও জানে ওর এই চাওয়াটা বড্ড কঠিন। কারণ তার রাস্তা যে সুগম নয়। পদে পদে কাঁটা বিছানো আছে তাতে।
— মাসি ও মাসি;
— বল, কি হয়েছে শিউলি ফুল? জল খাবি?
— না।
— তাহলে কোন কষ্ট হচ্ছে?
— আরে না গো; শোনই না। কাল তো স্বাধীনতা দিবস।
— হঁ্যা জানি। তাতে আমাদের কি? আমরা তো আর স্বাধীন না; আমরা হলাম পরাধীন।
— আচ্ছা মাসি কাল চলো না আমরা সবাই মিলে একটু ঘুরে আসি। আমি তো কোনদিন কোথাও যাইনি। চলো না গো কাল!
শিউলির ইচ্ছে ফেলতে পারে না শ্যামা। আবার ভাবে তাদের মক্ষী রানী গোলাপি মাসি তো রাজি হবে না। কি যে করবে ও ভেবে পায় না। ওই নিষ্পাপ মেয়েটার মুখের দিকে তাকালে বড্ড মায়া হয় ওর। মুখে বলে,
— দাঁড়া দেখি কিছু করা যায় কিনা। তুই এখন শুয়ে থাক। জ্বর না কমলে কিন্তু কিচ্ছু হবে না।
— আমার জ্বর কমে যাবে আজই। তুমি শুধু আমাকে নিয়ে চলো।
— দাঁড়া দেখি কি করা যায়!
রাতে ময়না, বিজলি, মহুয়া সবাইকেই শিউলির ইচ্ছের কথা জানায়। সবাই রাজি হয় যেতে। কিন্তু ভয়ে আবার পিছিয়ে যায়। শ্যামা তখন ওদের বলে, আচ্ছা আমি একবার মাসিকে জানাই।
সবাই ওকে বারণ করে যেতে। কারণ গোলাপি মাসি বড্ড রাগী। ওদের কোন কথাই শুনবে না। তাও শ্যামা নাছোড়বান্দা।
ধীরে ধীরে এক পা, দু পা করে গোলাপি মাসির দরজায় গিয়ে দাঁড়ায় শ্যামা। মাসি তখন টাকা গুনতে ব্যস্ত।
— মাসি ঘুমাচ্ছ নাকি?
— কে (খ্যাড়খ্যাড়ে গলায়)?
— আমি শ্যামা।
— ও তা তোর আবার এখন কি চাই? চার দিনের জন্য তো মাগী তোর ছুটি।
— ভিতরে আসবো?
— আয়; কি বলার আছে তাড়াতাড়ি বলে বিদেয় হ।
মাসি বলছিলাম যে (ঢোক গিলে)
—কি বলছিলি বল না তাড়াতাড়ি।
— না আসলে শিউলির খুব ইচ্ছে কাল একটু বেড়াতে যাওয়ার। কাল তো স্বাধীনতা দিবস তাই। মেয়েটার শরীরটা ভালো না, জানো মাসি। জ্বর। আর আমার কাছে এমনভাবে বলল, আমি মানা করতে পারলাম না।
— শখ দ্যখো। বেশ্যার মেয়ের আবার ঘোরার শখ। যা যা হবে না এসব। কাল কত বাবুরা আসবে জানিস? ধান্দা না করে ওরা ঘুরতে যাবে। উঃ…ঢং। হবে না বলে দে।
— আচ্ছা মাসি, ঘর থেকে বেরিয়ে যায় শ্যামা, মনে মনে মাসির চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে। জীবনে টাকা ছাড়া আর কিছু চিনল না। মায়া—দয়াও নেই শরীরে। ওদিকে সবাই শ্যামার জন্য অপেক্ষা করছে। শ্যামা ঘরে ঢুকতেই সবাই ঘিরে ধরে।
মহুয়া বলে, কিরে শ্যামা, কি খবর? মাসি রাজি হলো?
— না রে (মন খারাপ করে)। তোরা জানিস না মাসি কেমন? কাল অনেক বাবু আসবে। তাই হবে না।
ময়না বলে, আমি তো আগেই জানতাম হবে না। তোরাই আমার বারণ শুনলি না। যাক আর মন খারাপ করিস না। অনেক রাত হলো। চল এবার শুয়ে পড়ি।
— হঁ্যা, সেই ভালো।
বিজলি বলে, আমরা পরাধীন কিনা; তাই আমাদের কোনো ইচ্ছে থাকতে নেই।
যে যার ঘরে শুতে চলে যায়।
সকাল হতে না হতেই গোলাপি মাসির চিৎকার শোনা গেলÑ
— কই রে সুবল, ভোলা তোরা কোথায়?
— এই তো মাসি বল।
— শোন আজ সব বাবুদের আসতে বারণ করে দিবি। বলবি আজ কোন ধান্দা হবে না।
— কেন মাসি? আজ তো স্বাধীনতা দিবস। আর প্রতি বছর তো এই দিনে অনেক বাবুরা আসে। এইসব বিশেষ বিশেষ দিনেই না রোজগার ভালো হয়।
— চুপ কর শালা। খালি টাকার চিন্তা। আজ কিছু হবে না। আজ আমরা সব মেয়েরা মিলে বেড়াতে যাবো।
— মাসি তুমি যাবে বেড়াতে?
— (রেগে গিয়ে) কেন রে ভোলা? আমার কি কোথাও যাবার মানা আছে? যা বললাম তাই কর গিয়ে।
শ্যামার ঘরে গিয়ে দেখে ও চুপ করে শুয়ে আছে।
— এই শ্যামা; ওঠ তো।।
— আরে মাসি তুমি! কিছু বলবে??
— হঁ্যা; যা গিয়ে বিজলী, ময়না, মহুয়াকে তৈরি হতে বল। শিউলিকে তৈরি কর। আজ আমরা সারাদিন ঘুরব, বেড়াবো। স্বাধীন হয়ে বাঁচবো একটা দিন।
— মাসি (বেশ অবাক হয়ে)
— হারে চিরটাকাল তো এই টাকার পিছনেই ছুটে গেলাম। যৌবনে শরীরটাও বিকিয়ে দিয়েছি। আজ এই এলাকার মাসি হয়েছি। মক্ষী রাণী তকমা পেয়েছি। সমাজ আমাদের এক ঘরে করেছে। তবে ওই বাচ্চা মেয়েটা আমার চোখ খুলে দিয়েছে রে। চল্, চল্ আর দেরি করিস না, বলে বেরিয়ে যায় গোলাপি মাসি।
শ্যামা গিয়ে সবাইকে বলে মাসির রাজি হওয়ার কথা। সবাই তো খুব খুশি। সবাই সেজেগুজে বেড়াতে যায়। সেদিন ওরা গড়ের মাঠ, ভিক্টোরিয়া, চিড়িয়াখানা, গঙ্গার ঘাট অনেক জায়গায় যায়। ফুচকা, আইসক্রিম খায়। শিউলিও খুব মজা করে। তারপর সন্ধ্যাবেলা সবাই বাড়ি ফেরে। যাক একদিনের জন্য হলেও স্বাধীনতা দিবসের দিন ওরাও স্বাধীন হয়েছিল। হোক না বেশ্যা। কিন্তু আনন্দ করার, বেড়াতে যাওয়ার অধিকার তো ওদেরও আছে তাই না!
হাকিম পাড়া শিলিগুড়ি

Facebook Comments Box

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১