আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ গত বছরের অক্টোবরে ৮০ বছরে পা দিয়েছে। দীর্ঘ এই সময় ধরে টিকে থাকা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকটগুলো সংস্থাটির কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার অবৈধ আগ্রাসন, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে মানবিক বিপর্যয় এবং সর্বশেষ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের বলপ্রয়োগ—এই ঘটনাগুলো জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। এসব প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি কি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে?
নিরাপত্তা পরিষদ ও কাঠামোগত জটিলতা
জাতিসংঘের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান অঙ্গ হলো নিরাপত্তা পরিষদ। সংস্থাটির সনদ অনুযায়ী, কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিষদের অনুমোদন অপরিহার্য। পরিষদে মোট ১৫টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে—এর মধ্যে চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি স্থায়ী সদস্য (পি-৫)। বাকি ১০টি দেশ দুই বছরের জন্য অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়।
নিরাপত্তা পরিষদের কোনো প্রস্তাব পাস করতে হলে কমপক্ষে ৯টি সমর্থনসূচক ভোট প্রয়োজন এবং কোনো স্থায়ী সদস্য ভেটো দিলে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। এই ভেটো ব্যবস্থার ফলে শান্তি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যত পি-৫ দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কাঠামোটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারে। ভারসাম্য রক্ষার যুক্তিতে গড়া এই ব্যবস্থা তখনই ভেঙে পড়ে, যখন স্থায়ী সদস্যরাই নিয়ম লঙ্ঘন করে।
ভেটো ব্যবস্থা ও সংস্কারের সীমাবদ্ধতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা দেখিয়েছে, গুরুতর আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও ভেটো ক্ষমতা নিরাপত্তা পরিষদকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দিতে পারে। জাতিসংঘ সনদে ভেটো ব্যবহারের ওপর কোনো আইনি সীমা না থাকায়, সদস্য রাষ্ট্রগুলো কেবল রাজনৈতিক আপত্তি তুলতে পারে, আইনি চ্যালেঞ্জ নয়।
সনদের ১০৮ ও ১০৯ অনুচ্ছেদে ভেটো ব্যবস্থার সংস্কারের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, যে দেশগুলোর সম্মতি ছাড়া সংস্কার সম্ভব নয়, তারাই এই ক্ষমতার সুবিধাভোগী। ফলে বর্তমান কাঠামো ভেঙে নতুন সনদের অধীনে জাতিসংঘ পুনর্গঠনের ধারণা তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে বৈশ্বিক ঐকমত্যের অভাবে তা প্রায় অলীক।
ব্যর্থতার মাঝেও প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান
যখন পি-৫ ভুক্ত কোনো দেশ নিজেই আগ্রাসনে জড়ায়, তখন নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে না। এ কারণে বড় বড় সংঘাতে জাতিসংঘকে ব্যর্থ মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে এই ব্যর্থতা পুরোপুরি সংস্থাটির অকার্যকারিতা নয়, বরং এর গঠনতন্ত্রের সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
নিরাপত্তা পরিষদের বাইরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, মানবিক ত্রাণ সমন্বয়, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাসহ বহু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এই কাজগুলো এমন, যা একক কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে করা সম্ভব নয়।
অস্বস্তিকর বাস্তবতা
অস্বস্তিকর সত্য হলো, জাতিসংঘ হয়তো নিখুঁত নয়, তবে এর অনুপস্থিতি বিশ্ব পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। পরাশক্তিদের জবাবদিহির বাইরে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এখনো জরুরি। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের দ্বিচারিতার কারণে পুরো প্রতিষ্ঠানকে বাতিল করে দেওয়ার চেয়ে এর কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা আরও প্রয়োজন।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?