clock ,

সেন্টমার্টিন রক্ষায় চার জোনের প্রস্তাব, পর্যটনে কড়াকড়ি আসছে

সেন্টমার্টিন রক্ষায় চার জোনের প্রস্তাব, পর্যটনে কড়াকড়ি আসছে

দীর্ঘদিনের সরকারি অবহেলা, অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন লাগামহীন পর্যটনের চাপে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন দ্বীপ এখন অস্তিত্ব সংকটে। প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে গড়ে ওঠা মুনাফাকেন্দ্রিক স্থাপনার ভার বইতে হচ্ছে দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র স্থানীয় বাসিন্দাদের। এই প্রেক্ষাপটে সেন্টমার্টিন সংরক্ষণে দ্বীপটিকে চারটি পৃথক জোনে ভাগ করার প্রস্তাব এসেছে খসড়া মহাপরিকল্পনায়।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) প্রণীত এই খসড়া মহাপরিকল্পনা গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক কর্মশালায় উপস্থাপন করা হয়।

চার জোনে ভাগের প্রস্তাব

খসড়া মহাপরিকল্পনা অনুযায়ীজেনারেল ইউজ জোনে পর্যটনসহ সাধারণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলবে। সব হোটেল রিসোর্টকে এই জোনের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ম্যানেজড রিসোর্স জোন কচ্ছপের প্রজনন এলাকা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে পর্যটকরা দিনে ভ্রমণ করতে পারবেন, তবে রাতযাপন নিষিদ্ধ থাকবে। স্থানীয় বাসিন্দারাও এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন না।

সাসটেইনেবল ইউজ জোনে রয়েছে বুশল্যান্ড, লেগুন ম্যানগ্রোভ বন। এই এলাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী কতটুকু কীভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে, তা সরকার নির্ধারণ করবে। পর্যটকরা দিনে প্রবেশ করতে পারলেও রাতযাপনের অনুমতি থাকবে না।

সবশেষে রেস্ট্রিক্টেড জোনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে কোনো ধরনের প্রবেশই অনুমোদিত হবে না।

পর্যটন নয়, সংরক্ষণই অগ্রাধিকার


কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন জলবায়ু পরিবর্তন, তথ্য সম্প্রচার এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সরকার এই মুহূর্তে সেন্টমার্টিনের হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “সেন্টমার্টিন পর্যটন সমার্থক হতে পারে না।

তিনি জানান, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নয় মাস পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। তবে খসড়া মহাপরিকল্পনায়পর্যটনশব্দের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

রিজওয়ানা হাসান বলেন, “আট হাজার মানুষের দ্বীপে প্রতিদিন যদি ১০ হাজার পর্যটক যান, তাহলে তা স্থানীয়দের জীবন পরিবেশের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে।তিনি জোর দিয়ে বলেন, সেন্টমার্টিনে পর্যটন হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক এবং অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত।

বিকল্প জীবিকার কথা


উপদেষ্টা জানান, দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরিতে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ভূমিকা রাখবে। হস্তশিল্প, মাছ ধরা এবং সীমিত পরিসরে পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে সম্ভাব্য বিকল্প জীবিকা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রবাল জীববৈচিত্র্য নিয়ে শঙ্কা


বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান বলেন, সেন্টমার্টিনের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রবাল ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে এবং দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের একটি বড় এলাকা সম্প্রতি বিলীন হয়েছে। তাঁর মতে, সব মৌসুমে দ্বীপটিকে নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. কামরুজ্জামান জানান, সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে এবং ভবিষ্যতে কেবল প্রকৃতিবান্ধব স্থাপনা নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা


এই মহাপরিকল্পনায় সহায়তাকারী সংস্থা জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)এর বাংলাদেশের ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেনটেটিভ সোনালী দায়ারত্নে বলেন, জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ সেন্টমার্টিন সংরক্ষণের উদ্যোগে যুক্ত হতে পেরে তারা আনন্দিত।

খসড়া মহাপরিকল্পনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?

আমাদের অনুসরণ করুন

জনপ্রিয় বিভাগ

সাম্প্রতিক মন্তব্য