উত্তরাঞ্চলের নওগাঁ ও জয়পুরহাট জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। চলতি মৌসুমে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা জনজীবনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করেছে। হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, পাশাপাশি কৃষিতে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা।
ঘন কুয়াশা ও উত্তরের শীতল বাতাসে সকাল পর্যন্ত চারপাশ ঢাকা থাকছে। দিনের বেলাতেও সূর্যের দেখা মিলছে না অনেক সময়। কুয়াশার কারণে মহাসড়ক ও অভ্যন্তরীণ সড়কে ছোট-বড় যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে।
২৪ ঘণ্টায় তাপমাত্রা কমেছে সাড়ে চার ডিগ্রি
নওগাঁর বদলগাছী কৃষি ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন তাপমাত্রা ছিল ১১ ডিগ্রি। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে চার ডিগ্রি তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে কয়েকগুণ।
বদলগাছী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হামিদুল ইসলাম জানান, বুধবার ভোর ৬টায় নওগাঁর বদলগাছী ও জয়পুরহাটে একযোগে মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কিছুটা রোদের দেখা মিললেও শীতের প্রকোপ কমেনি।
শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে ঝুঁকিতে
চিকিৎসকদের মতে, তীব্র শীতে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক শিশু শীতজনিত অসুস্থতার কারণে স্কুলে যেতে পারছে না, আর বয়স্করা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।
জয়পুরহাট ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রাশেদ মোবারক জুয়েল বলেন, “কয়েক দিনের প্রচণ্ড ঠান্ডায় শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। প্রয়োজন ছাড়া তাদের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।”
থমকে গেছে শ্রমজীবী মানুষের জীবন
নওগাঁ শহরের চকবাড়িয়া এলাকার রিকশাচালক মজিদ বলেন, “শীতে শরীর অবশ হয়ে আসে। মানুষ কম বের হয়, আয়ও কমে গেছে। তবুও পরিবার চালাতে রিকশা চালাতে হচ্ছে।”
দিনমজুর আব্দুল জলিল জানান, ভোরে কাজে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কাজ কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
কম্বল বিতরণ, আরও সহায়তার প্রস্তুতি
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আশিকুর রহমান জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার ৬০০টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। শীতের তীব্রতা বাড়লে বিতরণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। অতিরিক্ত ১ লাখ ১০ হাজার কম্বল বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
কৃষিতে শীতের ধাক্কা,
শীতের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে নওগাঁ জেলায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে প্রায় ৯ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে বীজতলা প্রস্তুত হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা ও প্রচণ্ড শীতে বোরো বীজতলায় ‘কোল্ড ইনজুরি’ দেখা দিয়েছে। এতে চারা হলুদ ও লালচে হয়ে পচে যাচ্ছে। চারা বাঁচাতে পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখতে হচ্ছে।
মান্দা
উপজেলার কৃষক কাজী আবুল
কাসেম বলেন, “পলিথিন দিয়ে ঢেকেও অর্ধেক
চারা নষ্ট হয়ে গেছে।”
নওগাঁ সদর উপজেলার সরাইল
গ্রামের কৃষক আব্দুল মতিন
জানান, ঘন কুয়াশায় তার
বীজতলার প্রায় ৮০ শতাংশ চারা
নষ্ট হয়েছে।
কৃষি বিভাগের পরামর্শ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ হুমায়রা মন্ডল বলেন, এখন পর্যন্ত ক্ষতির বড় অংশ পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। তিনি কোল্ড ইনজুরি মোকাবিলায় রাতে হালকা সেচ, পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
শৈত্যপ্রবাহ আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। ফলে জনজীবন ও কৃষিতে শীতের প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?