ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো–কে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার খবরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমের দাবি, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় পরিচালিত এক অভিযানের পর মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কে আনা হয়েছে এবং বর্তমানে তাঁকে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টার-এ রাখা হয়েছে।
এই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে—ভেনেজুয়েলার এই প্রেসিডেন্ট কেন যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর তীব্র আক্রোশের কেন্দ্রে পরিণত হলেন?
ক্ষমতায় উত্থান ও বিতর্কিত শাসন
একসময় বাসচালক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা থাকা মাদুরো রাজনীতিতে উঠে আসেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ–এর হাত ধরে। চাভেজের দল ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলা (পিএসইউভি)-এর নেতৃত্বে তিনি ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট হন। চাভেজ ও মাদুরোর প্রায় ২৬ বছরের শাসনামলে জাতীয় পরিষদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় হয়।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হলেও বিরোধী জোট দাবি করে, প্রকৃতপক্ষে তাদের প্রার্থী এদমুন্দো গনসালেস বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো নির্বাচনে নিষিদ্ধ থাকায় গনসালেস প্রার্থী হন। পরে ‘স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের সংগ্রাম’-এর জন্য মাচাদো নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
অভিবাসন সংকট ও ট্রাম্পের অভিযোগ
ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে লাখ লাখ ভেনেজুয়েলান অভিবাসী প্রবাহের জন্য দায়ী করে আসছে। ২০১৩ সালের পর থেকে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট ও দমন-পীড়নের কারণে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ ভেনেজুয়েলা ছেড়েছেন।
ট্রাম্পের অভিযোগ, মাদুরো ‘কারাগার ও মানসিক আশ্রম খালি করে’ অপরাধীদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছেন—যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
মাদক, সন্ত্রাস ও সামরিক চাপ
ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার দুটি অপরাধী নেটওয়ার্ক—Tren de Aragua এবং Cartel de los Soles—কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করে। ট্রাম্প দাবি করেন, দ্বিতীয়টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং মাদুরো। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ‘কার্টেল দে লোস সোলেস’ কোনো কেন্দ্রীয় সংগঠন নয়; বরং দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের একটি ছাতার নাম।
মাদুরো এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তথাকথিত ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’-কে অজুহাত বানিয়ে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এবং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদের দখল নিতে চাইছে।
নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ ও গোপন অভিযান
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্প মাদুরোর বিরুদ্ধে পুরস্কারের অঙ্ক দ্বিগুণ করেন এবং ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজে পূর্ণ নৌ অবরোধ আরোপ করেন। একই সঙ্গে ক্যারিবীয় অঞ্চলে বড় সামরিক বহর মোতায়েন করা হয়।
অক্টোবরে ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানান, ভেনেজুয়েলার ভেতরে গোপন অভিযান চালাতে সিআইএ-কে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের হামলা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুললেও হোয়াইট হাউস দাবি করে, তারা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনেই পদক্ষেপ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত পরিণতিই হলো মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কঠোর অবস্থান।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?