ষাট বছরে পদার্পন করলো সিঙ্গাপুর। ছোট্ট এক জেলে পল্লী থেকে আজকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়া ‘লিটল রেড ডট’ তার সক্ষমতার চেয়েও অনেক বেশি ছাপ রেখেছে, আর তাইতো হীরক জয়ন্তী উদযাপন হলো মহাসমারোহে। যদিও বছর জুড়েই ছিল নানান আয়োজন। গত ৩ আগস্ট রাষ্ট্রীয় ভবন ইসতানায় বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জাতীয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী লরেন্স অঙ এর ভাষণ গত ৮ আগস্ট বিভিন্ন ভাষায় সম্প্রচারিত হয়।

চলতি বছরের SG60 জাতীয় দিবস প্যারেড ছিল সবচেয়ে বড় এবং স্মরণীয়! “মাজুলা সিঙ্গাপুরা” (Majulah Singapura) থিমের আলোকে সকল সিঙ্গাপুরবাসীকে আহ্বান জানানো হয় বিগত ছয় দশকের জাতি গঠনের ইতিহাস নিয়ে ভাবতে এবং একইসঙ্গে ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদ ও সহনশীলতা নিয়ে এগিয়ে যেতে। এই থিমটি একদিকে যেমন অতীত অর্জনের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়, তেমনি নতুন প্রজন্মকে আহ্বান জানায় ঐক্য, সাহস ও অগ্রগতির চেতনায় সিঙ্গাপুরকে আরও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য।

মজুলা মোমেন্ট’ ছিল জাতীয় ঐক্যবদ্ধ মুহূর্ত, যেখানে মিছিলকারী কন্টিনজেন্টের সদস্যরা সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের সঙ্গে একত্রে শপথ পাঠ ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ায় অংশ নেন।

জাতীয় দিবস উদযাপনের জন্য দুটি আকর্ষণীয় স্থান নির্ধারণ করা হয়—পাদাং ও মেরিনা বে। মূল প্যারেড পাদাংয়ে হলেও দুই স্থানে অনুষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে চলে, ফলে দুই স্থানের দর্শকরাই একইসঙ্গে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। প্রায় ২৭,০০০ মানুষ জাতীয় দিবস প্যারেডে অংশ নিতে পার্লামেন্ট হাউসের কাছে পাদাং মাঠে সমবেত হন। পুরো শহরজুড়েই ছিল আলো প্রদর্শনী ও আতশবাজির ঝলক। মেরিনা বে-তে এলইডি স্ক্রিনে পাদাং থেকে সরাসরি অনুষ্ঠান সম্প্রচার হয়। এছাড়া রেড লায়নস, রাষ্ট্রীয় পতাকা ফ্লাইপাস্ট, প্রেসিডেন্সিয়াল গান স্যালুট ও অন্যান্য নিয়মিত আয়োজনও ছিল। এনডিপি ২০২৫-এ আবার ফিরেছে মোবাইল কলাম, যেখানে বিমান, স্থল ও সমুদ্র এই তিন ক্ষেত্রের সামরিক যানবাহন ও উপকরণ প্রদর্শিত হয়। তবে সবার মন জয় করেছে চার্লি লিম, কিট চ্যান ও দ্য আইল্যান্ড ভয়েসেসের পরিবেশনায় জাতীয় দিবসের থিম সং “Here We Are”। ১৯৮০-এর দশকের অতিমিষ্ট ও প্রচারণামূলক গানের ভাষা থেকে এবারের গানটি স্পষ্টতই আলাদা। এই গানটি যেন এক প্রতীক যে দেখায় আধুনিক সিঙ্গাপুর ‘জাতি গঠনের’ প্রাথমিক অধ্যায় অতিক্রম করে এখন শিল্পীদের সেই পরিসর দিচ্ছে, যেখানে তারা পরিচয়ের জটিলতা নিয়ে ভাবতে পারেন এবং তা সৃষ্টিশীলভাবে প্রকাশ করতে পারেন। চার্লি লিম সুরকার চক কেরং-এর সঙ্গে গানটি যৌথভাবে লিখেছেন। তিনি বলেন, আমি চেষ্টা করেছি এমন এক সময়ের চেতনা তুলে ধরতে যেখানে পৃথিবীজুড়ে টানাপোড়েন, বিভাজন ও হৃদয়ভাঙার ঘটনা ঘটছে; কিন্তু এর মধ্যেও যেন গর্ববোধের একটা স্পর্শ থাকে। তবে এবারের জাতীয় দিবসের গানে অনুচ্চারিত রয়ে গেছে একটি শব্দ তাহলো ‘সিঙ্গাপুর’। এটিও যেন একটি সচেতন ও প্রতীকী সিদ্ধান্ত। ২ লাখেরও বেশি দর্শকের জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা এবারের অনুষ্ঠানের আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে।
প্রতি বছরই জাতীয় দিবসের উইকেন্ডে সিঙ্গাপুরবাসীরা দেশের হার্টল্যান্ড এলাকায় উৎসবমুখর উদযাপনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। ১০ আগস্ট বিসান, পুঙ্গল, ইয়িশুন, গেইল্যাং ও বুকেৎ গোম্বাকে আলাদা থিম নিয়ে জাতীয় দিবস হার্টল্যান্ড উদযাপন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ফাইটার জেট ফ্লাইপাস্ট, প্রদর্শনী, কমিউনিটি ইভেন্ট, লাইভ পারফরম্যান্স, ড্রোন শো, শিশুদের স্কেটিং এবং আতশবাজি প্রর্দশন করা হয়। শিল্পপ্রেমীদের জন্য কমিউনিটি আর্ট ইনস্টলেশনে অংশগ্রহণের সুযোগও রাখা হয়। এদিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিলো চারটি F-16 ডায়মন্ড ফর্মেশনে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৬:৩০টার মধ্যে আকাশে ফাইটার জেট ফ্লাইপাস্ট, যা প্রতিটি স্থানে দুইবার লুপ করে।
বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট এসজি৬০ উপলক্ষে সিঙ্গাপুরবাসীর জন্য আকর্ষণীয় খাদ্য, অফার ও স্টেকেশনের গাইড প্রস্তুত করেছে, যা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সুন্দর মেলবন্ধন তুলে ধরে।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?