মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ জীবনের শতবর্ষে পা রেখেছেন। একশো বছরের মাইলফলক ছোঁয়ার প্রাক্কালে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে এক খোলামেলা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে।
মাহাথির বলেন, “গণতন্ত্র মানুষের তৈরি একটি পদ্ধতি, কিন্তু এটি নিখুঁত নয়। যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে এর ফলও ইতিবাচক হয় না।” তাঁর মতে, গণতন্ত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন মাত্র দুটি রাজনৈতিক দল থাকে। “কিন্তু এখন সবাই নেতা হতে চায়, ফলে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে কোনো পক্ষই শক্তিশালী সরকার গঠনে সক্ষম হয় না। এটাই গণতন্ত্রের ব্যর্থতা।”
সাক্ষাৎকারে মাহাথির কেবল রাজনৈতিক পদ্ধতিরই নয়, সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থারও কঠোর সমালোচনা করেন। গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনকে “গণহত্যা” আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “একটি জাতিকে ধ্বংস করতে ক্ষুধা ও যুদ্ধকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এই অপরাধের মদদদাতা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এটি স্পষ্টভাবে আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার পতনের প্রতিচ্ছবি।”
তিনি বলেন, “মানবিক মূল্যবোধ আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। বিশ্বনেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বাসযোগ্য নয়।”
প্রায় এক শতাব্দী দীর্ঘ জীবনে সুস্থ ও সক্রিয় থাকার রহস্য সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহাথির বলেন, “অতিরিক্ত খাবার পরিহার করি। প্রতিদিন শরীরচর্চা করি। নিয়মিত পড়ি, লিখি, বিতর্ক করি—এইভাবে মানসিকভাবে নিজেকে ব্যস্ত রাখি।” এই প্রসঙ্গে স্ত্রী সিতি হাসমাহর অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন মাহাথির।
মালয়েশিয়ার ভবিষ্যৎ এবং মুসলিম বিশ্বের অগ্রগতি নিয়েও মত দিয়েছেন তিনি। মাহাথির মনে করেন, “মালয়েশিয়ার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন অত্যন্ত জরুরি। আর মুসলিম বিশ্বের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হচ্ছে ঐক্যের অভাব। ফিলিস্তিন ইস্যুতে পর্যন্ত একমত হতে পারে না মুসলিম দেশগুলো। ওআইসি-ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না।”
১৯২৫ সালের ১০ জুলাই ব্রিটিশ মালয়েশিয়ার কেদাহ প্রদেশে জন্ম নেওয়া মাহাথির পেশায় একজন চিকিৎসক হলেও মাত্র ২১ বছর বয়সে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি—দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদি শাসক হিসেবে। তাঁর শাসনামলেই মালয়েশিয়া অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক উন্নয়ন অর্জন করে। এরপর ২০১৮ সালে আশির দশক পেরিয়েও আবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং ২০২০ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
মাহাথির মোহাম্মদের শতবর্ষ শুধু এক ব্যক্তির জীবন নয়—এ যেন আধুনিক মালয়েশিয়ার ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?