আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলম (এস আলম) ও তার পরিবারের দায়ের করা মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে ব্রিটিশ একটি ল ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ল ফার্মকে ঘণ্টায় ১ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার ফি দিতে হবে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই ল ফার্ম নিয়োগ এবং অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে দায়ের করা আন্তর্জাতিক সালিশি মামলা—আইসিএসআইডি (কেস নম্বর: এআরবি/২৫/৫২)—পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক আইনি সেবা ক্রয়ের একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবটি পর্যালোচনা শেষে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি ব্রিটিশ ল ফার্ম ‘হোয়াইট অ্যান্ড কেইস এলএলপি’-কে নিয়োগের অনুমোদন দেয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এস আলমের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসংক্রান্ত যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা চ্যালেঞ্জ করে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অধীনস্থ ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (আইসিএসআইডি)-এ মামলা করা হয়েছে। এ মামলায় সরকারের পক্ষে আইনি লড়াই চালাতে আন্তর্জাতিক মানের আইনজীবী নিয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “এটা বহু টাকার এবং অত্যন্ত জটিল বিষয়।”
কোন প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তা একটি ব্রিটিশ ল ফার্ম, তবে নামটি ওই মুহূর্তে তার মনে নেই।
গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অবস্থিত আইসিএসআইডিতে এস আলম ও তার পরিবারের আইনজীবীরা আনুষ্ঠানিকভাবে সালিশি মামলার আবেদন জমা দেন। আবেদনে অভিযোগ করা হয়, অবৈধ অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার যে সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্ত ও অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে তাদের শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
সালিশি আবেদনে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের লক্ষ্য করে ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ বাজেয়াপ্ত, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ‘ভিত্তিহীন’ তদন্ত এবং ‘প্ররোচনামূলক মিডিয়া অভিযান’ পরিচালনা করছে—যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তির পরিপন্থি।
এস আলম পরিবার ২০০৪ সালের বাংলাদেশ–সিঙ্গাপুর দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় এ মামলা করেছে। নথি অনুযায়ী, তারা ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে এবং ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে তারা সিঙ্গাপুরে বসবাস করছে।
তারা দাবি করেছে, সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে তারা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের ১৯৮০ সালের বিদেশি ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আইনের অধীনেও সুরক্ষা দাবি করছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্ত এবং পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়। পাচার অর্থ উদ্ধারে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর অভিযোগ করেন, এস আলম পরিবার প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে।
অন্যদিকে, এস আলম গ্রুপ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, অভিযোগের পক্ষে সরকার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?