clock ,

অভিবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে কোম্পানি পরিচালকের জরিমানা

অভিবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে কোম্পানি পরিচালকের জরিমানা

২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের শর্ত হিসেবে অভিবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে লাখ ১২ হাজার ৪০০ ডলার ঘুষ নেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করার পর এক কোম্পানি পরিচালককে জরিমানা করা হয়েছে। ৬৮ বছর বয়সী লু কিম হুয়াতকে গত ২৪ জুলাই সিঙ্গাপুরের একটি জেলা আদালত ৯০ হাজার ডলার জরিমানা করে এবং অতিরিক্ত ৪২ হাজার ডলার আর্থিক দণ্ড প্রদান করে। তিনি বিদেশি কর্মসংস্থান আইন (Employment of Foreign Manpower Act) এর ছয়টি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। রায় ঘোষণার সময় আরও ১২টি অনুরূপ অভিযোগ বিবেচনায় নেওয়া হয়।

সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয় (MOM) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, লু কিম হুয়াত ছিলেন উইস হোল্ডিংস-এর পরিচালক এবং কনজারভেন্সি বিভাগের প্রধান। প্রতিষ্ঠানটি ওয়েইশেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল সার্ভিসেস পরিচালনা করে, যা বিভিন্ন টাউন কাউন্সিলের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষণাবেক্ষণ সেবা সরবরাহ করে।

তদন্তে জানা যায়, লু চার সহযোগীর সঙ্গে মিলে ওয়েইশেনের ১৮ জন অভিবাসী শ্রমিকের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করেন, যেটি ছিল তাদের ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের শর্ত। প্রতিজনের কাছ থেকে নেওয়া অবৈধ অর্থের পরিমাণ ছিল ৯০০ থেকে ,০০০ ডলারের মধ্যে। তার অপকর্মের সঙ্গী ছিলেন ওয়েইশেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল সার্ভিসেসের সাবেক সাইট ম্যানেজার লিম চুং সেন, কনজারভেন্সি কর্মী কবির মোহাম্মদ হুমায়ুন রোবেল, এবং বাংলাদেশভিত্তিক একটি এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সির এজেন্ট কামরুজ্জামান।

আদালতে প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, যে ১৮ জন বিদেশি শ্রমিকের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়া হয়েছিল, তাদের বেশিরভাগই টাউন কাউন্সিলের অধীন আবাসিক এলাকায় পরিচ্ছন্নতা রক্ষণাবেক্ষণ কাজে নিযুক্ত ছিলেন। ঘুষ আদায়ের এই চক্রটি মূলত ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঘটনা প্রকাশের পূর্বে চার থেকে পাঁচ বছর ধরে সক্রিয় ছিল এবং এই অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনাকারী ছিলেন কামরুজ্জামান। তিনি বাংলাদেশিদের সিঙ্গাপুরে ওয়েইশেনে কাজের জন্য পাঠানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ওয়েইশেনের মাধ্যমে যেসব বিদেশি শ্রমিকের ওয়ার্ক পারমিট প্রসেস করা হচ্ছে, তাদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করতে কামরুজ্জামান সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত নিজের আত্মীয়স্বজন, লিম, কবির রোবেলকে নির্দেশ দেন। এই ঘুষই ছিল তাদের চাকরি ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের অঘোষিত শর্ত। আদায়কৃত ঘুষের টাকা প্রথমে সংগ্রহ করতেন কনজারভেন্সি কর্মী কবির মোহাম্মদ হুমায়ুন রোবেল। তারা এসব অর্থ হস্তান্তর করতেন ওয়েইশেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল সার্ভিসেসের তৎকালীন সাইট ম্যানেজার লিম চুং সেনের কাছে। পরবর্তীতে লিম সেই অর্থ সরাসরি দিতেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক এবং কনজারভেন্সি প্রধান লু কিম হুয়াতের হাতে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, লু ছিলেন লিমের প্রত্যক্ষ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বিদেশি শ্রমিকের নিকট থেকে ঘুষ আদায়ের পর লিমকে কর্মীপ্রতি ৩০০ ডলার করে প্রদান করতেন লু। কোন কোন অভিবাসী শ্রমিকের ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন করা হবে সে সিদ্ধান্ত লু লিম যৌথভাবে নিতেন। কেবলমাত্র যারা ঘুষ পরিশোধ করতেন, তাদের নিয়েই মানবসম্পদ বিভাগে ইতিবাচক সুপারিশ পাঠানো হতো, যাতে তাদের ওয়ার্ক পারমিট সহজে নবায়ন হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বর, সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয় (MOM) ওয়েইশেন কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে তখন  Employment of Foreign Manpower Act লঙ্ঘনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তীতে তদন্তের মাধ্যমে পুরো ঘুষচক্রের জাল উন্মোচিত হয়।

জনশক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওয়েইশেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল সার্ভিসেসের সাবেক সাইট ম্যানেজার লিম চুং সেন ২০২৪ সালের আগস্টে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ৮৪ হাজার ডলার জরিমানার দণ্ড পেয়েছেন। অন্যদিকে, ঘুষ আদায়কারী কনজারভেন্সি কর্মী কবির মোহাম্মদ হুমায়ুনের বিরুদ্ধে মামলা এখনও আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, অপর অভিযুক্ত রোবেল এখনো পলাতক। এছাড়া, এই ঘুষ চক্রের মূল উদ্যোগকারী হিসেবে অভিযুক্ত বাংলাদেশি নিয়োগ এজেন্ট কামরুজ্জামান বর্তমানে সিঙ্গাপুরের আইনের আওতার বাইরে রয়েছেন বলে জানিয়েছে জনশক্তি মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন তবে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

মূল অভিযুক্ত লু কিম হুয়াত এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসী শ্রমিকদের ৮৩,০৫০ ডলার ফেরত দিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রে ক্ষতিগ্রস্ত ১৮ শ্রমিকের মধ্যে জন ইতোমধ্যে নিজ দেশে ফিরে গেছেন, বাকি জন এখনও সিঙ্গাপুরে কর্মরত রয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজন ওয়েইশেনে কাজ করছেন।

প্রসঙ্গত, সিঙ্গাপুরের Employment of Foreign Manpower Act অনুযায়ী, কর্মসংস্থান সংক্রান্ত ঘুষ আদায়ের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ৩০,০০০ ডলার পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

যেসব অভিবাসী শ্রমিক মনে করছেন, তাদের কাছে ওয়ার্কপাস নবায়নের শর্ত হিসেবে ঘুষ চাওয়া হচ্ছে তারা সিঙ্গাপুরের মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এর হেল্পলাইন ৬৪৩৮-৫১২২ নম্বরে বা মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স সেন্টারের ৬৫৩৬-২৬৯২ নম্বরে ফোন করে সহায়তা চাইতে পারেন।

জনশক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কেউ যদি বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে কোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানেন, অথবা Employment of Foreign Manpower Act লঙ্ঘনের বিষয় অবগত থাকেন, তবে মন্ত্রণালয়ে সম্পর্কে অভিযোগ জানানো উচিত। অভিযোগকারীর তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে বলেও আশ্বস্ত করেছে MOM

উল্লেখ ২০২৪ সালে নি সুন ইস্ট পাশির রিজ-পুঙ্গল এলাকায় এস্টেট পরিচ্ছন্নতাকারীদের তদারকি করা এক সংস্থার ম্যানেজারকে ২৪ সপ্তাহের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ডেরিক হো নামে ওই ম্যানেজার ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৫৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের কাছ থেকে ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের জন্য মোট ৩৯৬,৪৪০ ডলার ঘুষ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে নি সুন জিআরসি প্রতিনিধিত্বকারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে. শানমুগম হুইসেলব্লোয়ারের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে ব্যবস্থা নেন। 

You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?

আমাদের অনুসরণ করুন

জনপ্রিয় বিভাগ

সাম্প্রতিক মন্তব্য