মাইলস্টোন স্কুল ট্র্যাজেডিতে দগ্ধ সপ্তম শ্রেণির ছাত্র আরিয়ান আফিফের জন্য হাসপাতালে প্রতীক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন তাঁর খালু শামসুল হক। তবে সম্পর্কের সংজ্ঞা এখানে শুধু রক্তের নয়— ভালোবাসা, দায়িত্ব আর দীর্ঘ সময়ের নিবেদনে গড়ে ওঠা এক অপার মানবিক বন্ধন।
মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) দুপুরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সপ্তম তলায় স্বজনদের জন্য নির্ধারিত একটি চেয়ারে চোখের পানি লুকিয়ে বসে ছিলেন মধ্যবয়সী ব্যবসায়ী শামসুল হক। কাঁপা গলায় বললেন, “আব্বুজির জন্য বসে আছি। কোনো কথা বলছে না, শুধু একটু ইশারা করে। ৪০ শতাংশ পুড়ে গেছে।”
১৫ দিনের মাথায় শৈশবের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এই মানুষটি। আফিফের বাবা ইব্রাহীম হোসেন তখন ভারতে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। কিডনি প্রতিস্থাপনের পর আট বছর আগে তার মৃত্যু হয়। সেখান থেকেই শুরু— খালুর কোলেই বেড়ে ওঠা, মমতায় গড়া জীবন।
১২ বছরের আফিফ কখনো শামসুলকে ‘খালু’ বলেনি— বলেছে ‘আব্বুজি’। আর শামসুলের স্ত্রীকেই ডাকে ‘আম্মু’ বলে।
শামসুল জানান, “সন্তানের মতোই বড় করেছি ওকে। আমাদের জন্য কিছু কিনলে আফিফের জন্যও কিনি। এমনও হয়েছে, ওকে একটু বেশি দিয়ে ফেলেছি। আমার ছেলে-মেয়েও বলে, ‘তুমি আফিফকে বেশি ভালোবাসো।’”
তিনি জানান, দুর্ঘটনার সময় আফিফের খালাতো ভাই সাফওয়ান প্রথমে তাকে নিয়ে যান উত্তরার এক হাসপাতালে। ভর্তি করাতে না পেরে দ্রুত নিয়ে আসেন বার্ন ইনস্টিটিউটে।
শামসুল বলেন, “ওর হাত, মুখ, পিঠ পুড়ে গেছে। আমি কাছে গিয়ে বললাম— কেমন আছ? ও শুধু হালকা করে মাথা নাড়ল। খাবার খেয়েছ? না-সূচক ইশারা করল।”
আফিফের ছোটবেলার নানা স্মৃতি তুলে ধরে শামসুল বলেন, “ওর খতনা আমি করিয়েছি, প্রথম মিল্কশেক খাওয়া, গার্মেন্টে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া— সব আমার হাত ধরেই। একবার দেখি, গার্মেন্টের সব কর্মকর্তা কোলে নিয়ে ঘুরাচ্ছেন ওকে— আমার আব্বুজিকে রাজপুত্রের মতোই লাগছিল।”
তিনি বলেন, “ওর অনেক আবদার ও আমার কাছে করে, এমনকি বিকেলে খেলতে চাইলে মায়ের কাছে বলার সাহস পায় না, আমাকে দিয়ে বলায়। এখন শুধু চাই, ও আবার উঠে দাঁড়াক, মিল্কশেক খেতে চাওয়াক, বলুক— আব্বুজি।”
শুধু একটি বিমান নয়, এই দুর্ঘটনায় ভেঙে গেছে এমন অসংখ্য সম্পর্ক, ভালোবাসা আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। প্রতিটি মুখ যেন এক একটি গল্প— জীবনভর বুকের ভেতর চেপে রাখা এক ট্র্যাজেডির নাম।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?