ক্রিকেট–বিশ্ব বলতে আমরা যা বুঝি, তা আসলে এ উপমহাদেশকে ঘিরেই ঘুরপাক খায়। কারণ, ক্রিকেটের মূল অর্থনৈতিক বাজারটা এখানেই। এখানকার খেলা বা খেলা নিয়ে উন্মাদনা মানেই ক্রিকেট।
বিখ্যাত ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানী আশিস নন্দী বলেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়, এটি একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ ধর্ম’। ধর্ম ও জাতিবাদের বিভেদে এ অঞ্চলের মানুষকে একমাত্র ক্রিকেটই একসূত্রে গাঁথতে পারে। রাজনৈতিকভাবেও কূটনীতি হিসেবে কাজ করেছে ক্রিকেট। একসময় ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনা নিরসনে ক্রিকেট ডিপ্লোমেসির কথা শোনা যেত। কিন্তু ক্রিজে যত বল গড়িয়েছে, বিরোধপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্রিকেটকে এখানে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা হয়েছে।
ভারত-পাকিস্তানের পর সেখানে কি এখন বাংলাদেশের নামও যুক্ত হতে যাচ্ছে? এমন প্রশ্ন ইতিমধ্যে এসে গেছে; কারণ, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশে ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়া ক্রিকেট–দুনিয়ার সবচেয়ে বড় লিগ আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট তারকা মোস্তাফিজুর রহমানকে। এ ঘটনায় ভারতে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
খেলার সঙ্গে রাজনীতি মেশাবেন না—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দুনিয়ায় আলোচিত ও তর্কবিতর্কের একটা অনুষঙ্গ। কিন্তু খেলাকে আমরা যতই বিনোদন হিসেবে দেখতে চাই না কেন, সেটিকে রাজনীতির বাইরে রাখা আদৌ সম্ভব?
ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিরও অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ক্রিকেট। যে কারণে পাকিস্তানের ক্রিকেট নিয়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠী যে মনোভাব প্রকাশ করে, মোস্তাফিজের ক্ষেত্রেও তেমনটি দেখা গেল।
বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ভারতের সরকারি দল বিজেপির নেতা ও হিন্দুত্ববাদী ধর্মগুরুরা। তাঁদের কারও কারও মতে, এটি পুরো ভারতের হিন্দুদের জয়।
আইপিএলের নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মোস্তাফিজকে দলে ভিড়িয়েছিল বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খানের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। তবে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই দলটি থেকে তাঁকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিল বিসিসিআই।
অথচ গত মাসে আইপিএলের নিলামে মোস্তাফিজকে নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিল। যদিও তখন থেকেই আলোচনা তৈরি হয়েছিল যে মোস্তাফিজ আদৌ এবারের আইপিএলে খেলতে পারবেন কি না। হিন্দুত্ববাদী কিছু সংগঠন ও নেতাদের কেউ কেউ তাঁকে বাদ দেওয়ার দাবিও তুলেছিলেন। এমনকি মোস্তাফিজকে বাদ না দিলে খেলার পিচ নষ্ট করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ায় বিজেপি নেতাদের কাছ থেকে শাহরুখ খানকে ‘গাদ্দার’ তকমাও শুনতে হয়েছে।
কেন এই হুমকি এবং এরপর বাদ দেওয়ার নির্দেশ? চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে বাংলাদেশের। গত দেড় বছরের ঘটনাপ্রবাহ দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কতটা তলানিতে, তা কারও অজানা নয়।
তবে যতই উত্তেজনা তৈরি হোক না কেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনকে কোনোভাবে আক্রান্ত হতে হয়নি, যেটি বারবার ঘটেছে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের বেলায়। সংখ্যালঘু নিপীড়নে বিশ্বের অন্যতম সমালোচিত দেশ ভারতে একই সময় একের পর এক সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনার ঘটছে। সেটিকে আরও বাড়তে দিয়ে প্রতিবেশি দেশের সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে অপরাজনীতিতে মেতে আছে তারা।
এ নিয়ে ভারত একের পর এক যে নৈরাজ্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছে, তাতে একটি প্রশ্ন উঠেই যায়—শেখ হাসিনার পতন নিয়ে গত দেড় বছরেও ভারত কেন ‘রিয়েলিটি’ মেনে নিতে পারছে না?
পাকিস্তানের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটকেও যদি ভারত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা প্রকাশের হাতিয়ার বানায়, তাহলে উপমহাদেশে ক্রিকেটকে ঘিরে ভারতের যে সফট পাওয়ার গড়ে উঠেছিল, সেটি বড় ধাক্কা খাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও আপসহীন নেত্রী হিসেবে খ্যাত খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শেষশ্রদ্ধা জানাতে বুধবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশ সফর আসেন। পরদিনই প্রায় চার বছর বিরতির পর ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যান এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। কূটনীতিকেরা এ দুই ঘটনাকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের নির্বাচনকে সামনে রেখে দিল্লি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
তাহলে এমন বাস্তবতায় কেন মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ এল? ভারতের ক্রিকেট তারকাদের কারও কারও বক্তব্য, নিশ্চয়ই ওপর মহলের চাপ থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাহলে কি মোস্তাফিজ ইস্যুতে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন আরেকটা পর্যায়ে প্রবেশ করল? সেটি ঘটলে বলতেই হয়, দুই প্রতিবেশী দেশের জনগণের সম্পর্ক, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, উৎপাদনের স্বার্থে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের উন্নতির বিষয়টি আরও অনিশ্চয়তার মুখেই পড়তে যাচ্ছে।
খেলার সঙ্গে রাজনীতি যুক্ত হলে তাতে খেলারই ক্ষতি হয়। মাঠের কুশীলবেরা কখনো চান না খেলার সঙ্গে রাজনীতিকে জড়ানো হোক। সেই সঙ্গে খেলাকে ঘিরে যে অর্থনীতি এবং বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান বা রুটিরুজির ব্যবস্থা, সেখানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশে আইপিএলের জনপ্রিয়তা এবং এর বাণিজ্যিক প্রভাব বহুমুখী। ক্রিকেটপাগল দেশ হওয়ার কারণে ভারতের বাইরে আইপিএলের অন্যতম বড় বাজার হলো বাংলাদেশ। মোস্তাফিজ বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম তারকা। মোস্তাফিজসহ বাংলাদেশের বড় বড় তারকা আইপিএলে খেলার কারণে এ ক্রিকেট লিগের প্রতি আলাদা মনোযোগ থাকে এ দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের।
রাজনৈতিক কারণে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণ কোনোভাবেই ভালোভাবে নেবে না। ক্রিকেটপ্রেমীদের আরও বেশিই ক্ষুব্ধ করবে। এর ফলে আইপিএল থেকে বাংলাদেশি দর্শকেরা মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকবে। আরও বড় ধরনের প্রভাব ফেললেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।
বিরোধপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে আইপিএলের দরপতনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। এতে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিটা আইপিএলেরই হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধের কারণে পাকিস্তানি ক্রিকেট তারকারা ইতিমধ্যে আইপিএলে নিষিদ্ধ, এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটকেও শত্রু বানিয়ে আইপিএলের আবেদন বা সৌন্দর্য কতটা টিকিয়ে রাখতে পারবে ভারত?
প্রতিবেশী দেশগুলোর একটি বড় অভিযোগ হলো, ভারত তাদের ওপর বড় ভাইয়ের মতো আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। যেটিকে একাডেমিক ভাষায় বলা হয়—বিগ ব্রাদার সিনড্রোম, ভারতের মিডিয়ার ভাষায়—দাদাগিরি।
বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর নির্বাচনে কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে ভারতের সরাসরি বা পরোক্ষ সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যে কারণে একপর্যায়ে এসব দেশে ভারতের কূটনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশটির কূটনৈতিক ব্যর্থতা নিয়ে এমন প্রশ্নও উঠেছে, ভারত কি নিজেই তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতবিরোধিতা উসকে দিচ্ছে না?
দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং এর মাধ্যমে সরকারটি স্বৈরাচার হয়ে উঠল—এর জন্য ভারতের বড় দায় আছে।
শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখা এবং ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে তিনি ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর ধারাবাহিক ঘটনাবলিতে বাংলাদেশে ভারতবিরোধিতা অতীতের যেকোনো সময় থেকে এখন তুঙ্গে। মোস্তাফিজ ইস্যু বাংলাদেশের ভারতবিরোধিতার পালে আরও হাওয়া দেবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নিজেদের ফায়দা তুলতে ক্রিকেটে পাকিস্তানবিরোধিতাকে হাতিয়ার বানিয়েছে, এখন সেখানে বাংলাদেশবিরোধিতা যুক্ত হতে যাচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন তোলারও যথেষ্ট অবকাশ আছে।
পাকিস্তানের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটকেও যদি ভারত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা প্রকাশের হাতিয়ার বানায়, তাহলে উপমহাদেশে ক্রিকেটকে ঘিরে ভারতের যে সফট পাওয়ার গড়ে উঠেছিল, সেটি বড় ধাক্কা খাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
লেখক: প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
ইমেইল: rafsangalib1990@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব*
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?