সারাদিন দোকানে কাজ শেষে রাতে বাড়ি ফিরছিলেন খোকন চন্দ্র দাস। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন তিনি। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁকে গুরুতর আহত করার পর শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে বাড়িতে ফিরেছে তাঁর নিথর দেহ।
এমন নির্মম মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না নিহতের পরিবার, স্বজন ও এলাকার মানুষ। ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন তাঁরা।
নিহত খোকন দাস শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই গ্রামের পরেশ চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি কেউরভাঙ্গা বাজারে ওষুধ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা করতেন। শনিবার (শেষ খবর অনুযায়ী) সকালে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। রাত সাড়ে আটটার দিকে মরদেহ গ্রামের বাড়ি তিলই ঠাকুরবাড়িতে আনা হলে সেখানেই বাড়ির উঠানের এক কোণে তাঁকে দাফন করা হয়। শেষ বিদায় জানাতে শত শত মানুষ ভিড় করেন।
গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই এলাকায় খোকন চন্দ্র দাসের ওপর হামলা চালানো হয়। প্রথমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁকে আহত করা হয়, পরে শরীরে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ঢাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ পাঠানো হয়। পরে তাঁকে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
কনেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য স্বপন গোলদার বলেন, ‘আমরাই খোকনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই। তিনি হামলাকারীদের নাম বলে গিয়েছিলেন। তাঁর স্বীকারোক্তির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। এরপরও পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এলাকাবাসীর চাপের মুখে পুলিশ আসামিদের বাড়িতে অভিযান চালালেও তাদের পাওয়া যায়নি।’
আহত অবস্থায় খোকন দাস হামলাকারী হিসেবে কনেশ্বর এলাকার বাবুল খানের ছেলে সোহাগ খান (২৭) ও সামছুদ্দিন মোল্যার ছেলে রাব্বি মোল্যা (২১)-এর নাম বলেন। পরে পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে আরও একজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পায়—তিনি হলেন শহীদ সরদারের ছেলে পলাশ সরদার (২৫)। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার গভীর রাতে থানায় মামলা দায়ের করা হয়। নিহতের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস বাদী হয়ে মামলাটি করেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।
৩ জানুয়ারি রাতে তিলই গ্রামে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট উঠানে চাদর পেতে শুইয়ে রাখা হয়েছে খোকন দাসের নিথর দেহ। পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর স্ত্রী সীমা। বারবার তিনি প্রশ্ন তুলছিলেন, ‘চার দিন হয়ে গেল, এখনো কেন হামলাকারীদের ধরা হলো না? পুলিশ কেন অবহেলা করছে?’
ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিউল হক বলেন, ‘আসামিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ কাজ করছে।’ তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে টাকা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই হামলাটি করা হয় এবং পরিচয় শনাক্ত হয়ে যাওয়ায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে, আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এলাকায় ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?