যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ মাদক—বিশেষ করে কোকেন ও ফেন্টানিল—প্রবেশ করে, তার বড় অংশই আসে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথ দিয়ে। এই পথের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যুক্ত দক্ষিণ আমেরিকার তিন দেশ—কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়া—যারা বিশ্বে কোকেন উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। তবু যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলা কোকেন পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
এই অভিযোগকে অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখিয়ে গত শনিবার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট Nicolás Maduro কে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী। পরে তাঁর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও ষড়যন্ত্রের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বার্তা সংস্থা Associated Press (এপি) জানায়, মাদুরোকে গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, তিনি একটি “দুর্নীতিগ্রস্ত ও অবৈধ সরকার” পরিচালনা করছেন, যা মাদক পাচারের মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে টিকে ছিল এবং এর ফলে হাজার হাজার টন কোকেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে।
মাদুরোর বিরুদ্ধে প্রথম মাদক পাচারের অভিযোগ ওঠে ২০২০ সালে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। সর্বশেষ অভিযোগপত্রে তাঁর স্ত্রীর নামও যুক্ত করা হয়েছে। এটি বড়দিনের ঠিক আগে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে গোপনে দাখিল করা হয়।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, মাদুরো সিনালোয়া কার্টেল ও ট্রেন দে আরাগুয়ার মতো শক্তিশালী মাদক চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার টন কোকেন পাচারের সুযোগ করে দিয়েছেন। এসব চক্র সরাসরি ভেনেজুয়েলা সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহায়তা ও সুরক্ষা পেয়েছে বলেও দাবি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৫০ টন কোকেন ভেনেজুয়েলার ভেতর দিয়ে পাচার হয়েছে, যা দ্রুতগতির নৌযান, মাছ ধরার ট্রলার ও কনটেইনার জাহাজে বহন করা হতো।
বাস্তব তথ্য কী বলছে
মাদুরোকে গ্রেপ্তারের আগেই, গত অক্টোবরে ক্যারিবিয়ান সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মাদকবাহী নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পর বিষয়টি নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করে The New York Times। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের বড় ধরনের অমিল রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের Drug Enforcement Administration (ডিইএ)–র ২০১৯ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের প্রায় ৭৪ শতাংশ আসে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথ দিয়ে—যার সঙ্গে কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়া সরাসরি যুক্ত। ক্যারিবিয়ান সাগর দিয়ে আসে মাত্র ১৬ শতাংশ, যা মূলত কলম্বিয়ার উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে। ভেনেজুয়েলা থেকে সরাসরি পাচারের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই বললেই চলে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশগুলো থেকে কোকেনের বড় চালান প্রথমে মেক্সিকোতে পৌঁছায়। এরপর সেখান থেকে স্থলপথে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকে।
ফেন্টানিল পাচারের ক্ষেত্রেও ভেনেজুয়েলার কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকার প্রমাণ নেই। ডিইএ, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ফেন্টানিলের বড় অংশ উৎপাদিত হয় মেক্সিকোতে, যার রাসায়নিক উপাদান আসে মূলত এশিয়ার দেশগুলো—বিশেষ করে চীন থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের পেছনের কারণ
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্যারিবিয়ান সাগরে ছোট নৌযানে একের পর এক হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, সেগুলো ভেনেজুয়েলা থেকে আসা মাদক বহন করছিল। প্রতিটি ঘটনার পরই সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মাদক সেবনে মৃত্যুর বিষয়টি সামনে আনেন এবং বলেন, এসব মাদক মার্কিন সমাজকে ধ্বংস করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ড্রাগ অ্যাবিউজের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কোকেন সেবনে দেশটিতে মারা গেছেন প্রায় ২৯ হাজার ৪৪৯ জন। আর সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্য বলছে, শুধু ২০২৩ সালেই ফেন্টানিল সেবনে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৭২ হাজার মানুষের, যা ২০২৪ সালে কমে হলেও ছিল ৪৭ হাজারের বেশি।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলা ও নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিদ্যমান পরিসংখ্যান ও স্বাধীন গবেষণার সঙ্গে এর বাস্তব মিল সীমিত।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?