রাজনীতির মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করল নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জুলাই আন্দোলনের শহীদ ইসমাইল হোসেন রাব্বির বোন মিম আক্তার দলটির নাম ঘোষণা করেন।
দলটির আহ্বায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন নাহিদ ইসলাম, এবং সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন আখতার হোসেন।
নতুন দলে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ ঘোষণা করা হয়েছে:
সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক: সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব।
১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক: নুসরাত তাবাসসুম।
সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব: তাসনিম জারা ও নাহিদা সারওয়ার নিবা।
১ নম্বর যুগ্ম সদস্যসচিব: আরিফ সোহেল।
দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক: হাসনাত আবদুল্লাহ।
উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক: সারজিস আলম।
মুখ্য সমন্বয়ক: নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী।
যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক: আব্দুল হান্নান মাসউদ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক এবং নতুন দলে মুখ্য দায়িত্ব নেওয়া হাসনাত আব্দুল্লাহ এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, "গণভবন ও সংসদ ভবনে কে যাবে, তা নির্ধারণ করবে দেশের খেটে খাওয়া জনগণ। বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভাগ্য নির্ধারণ হবে এ দেশের মানুষের হাতেই, বাইরের কোনো শক্তির মাধ্যমে নয়।"
জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক এবং নবগঠিত রাজনৈতিক দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, "জুলাই অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের এই পথচলায় যাঁরা আমাদের সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে।" তিনি আরও বলেন, "জাতীয় নাগরিক কমিটি ইতোমধ্যে চারশোটি থানায় পৌঁছে কমিটি গঠন করেছে। অবশেষে ঐতিহাসিকভাবে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হলো, যা আগামী দিনে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, "ছাত্রদের নেতৃত্বে যে দলটি আত্মপ্রকাশ করছে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই। বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে ঐক্যবদ্ধভাবে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।"
নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা এবং আদর্শগত অবস্থান শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে বলে জানা গেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির ঘোষণাপত্র তুলে ধরা হলো:
আমরা হাজার বছরের ঐতিহাসিক পরিক্রমায় বঙ্গীয় ব-দ্বীপের জনগোষ্ঠী হিসেবে এক সমৃদ্ধ ও স্বকীয় সংস্কৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পত্তন ঘটে।
১৯৯০
সালে ছাত্র-জনতা বুকের তাজা
রক্ত দিয়ে সামরিক স্বৈরাচারকে হটিয়েছে। তথাপি স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও
আমরা গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার
নিশ্চিত করে—এমন একটি
রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে পারিনি।
বরং বিগত ১৫ বছর
দেশে একটি নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী
শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে বেপরোয়া
ব্যবহার করে গণতন্ত্রকে ধ্বংস
করা হয়েছে। বিরোধী মতের কণ্ঠরোধ, গুম,
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকে
একটি রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করা হয়েছে। সেই
লক্ষ্য নিয়েই আমরা জাতীয় নাগরিক
পার্টি (এনসিপি) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিচ্ছি। এটি হবে একটি
গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী
রাজনৈতিক দল।
আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
ভেঙে পড়া রাজনৈতিক, সামাজিক,
অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো
পুনরায় গড়ে তোলা ও
তাদের গণতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা হবে আমাদের
রাজনীতির অগ্রাধিকার। এর মধ্যদিয়েই কেবল
আমরা একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক
রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারব। আমাদের
সেকেন্ড রিপাবলিকে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে
মূলধারায় তুলে আনা হবে।
আমাদের রিপাবলিকে সাধারণ মানুষ, একমাত্র সাধারণ মানুষই হবে ক্ষমতার সর্বময়
উৎস। তাদের সব ধরনের গণতান্ত্রিক
ও মৌলিক অধিকারের শক্তিশালী সুরক্ষাই হবে আমাদের রাজনীতির
মূলমন্ত্র। আমাদের রিপাবলিক সব নাগরিককে দারিদ্র্য,
বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার
থেকে শক্তিশালী সুরক্ষা প্রদান করবে। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর কোনো অংশকেই অপরায়ন করা হবে না,
বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে সমান গুরুত্ব প্রদান
ও সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত
করা হবে। আমাদের অর্থনীতিতে
সম্পদ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর
হাতে পুঞ্জীভূত হবে না, বরং
সম্পদের সুষম পুনর্বণ্টন হবে
আমাদের অর্থনীতির মূলমন্ত্র। আমরা একটি ন্যায্যতা
ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় আমাদের
সংকল্প আবারও পুনর্ব্যক্ত করতে চাই। আমরা
দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জুলাই ২০২৪
গণ-অভ্যুত্থান কেবল একটি ফ্যাসিবাদী
শাসনের বিরুদ্ধেই বিজয় নয়, এটি আমাদের
ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও শপথ। এই নতুন
বাংলাদেশ গড়ায় আমরা সবাই
প্রত্যেকে যার-যার অবস্থান
থেকে শপথ করি। ঐক্যবদ্ধ
হই এবং আমাদের কাঙ্ক্ষিত
সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যাই। আমাদের দেশ,
আমাদের অধিকার, আমাদের ভবিষ্যৎ—আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক অধরা কোনো স্বপ্ন
নয়, এটি আমাদের প্রতিজ্ঞা!
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?