clock ,

এক্স পোস্ট বিস্ফোরণে তোলপাড় দেশ: নির্বাচনের নতুন অস্ত্র সোশ্যাল মিডিয়া

এক্স পোস্ট বিস্ফোরণে তোলপাড় দেশ: নির্বাচনের নতুন অস্ত্র সোশ্যাল মিডিয়া

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়া এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতার নতুন ময়দান। এক্স (সাবেক টুইটার), ফেসবুক কিংবা ইউটিউবএই প্ল্যাটফর্মগুলোতে একটি পোস্ট, একটি স্ক্রিনশট কিংবা একটি ভাইরাল ক্লিপ মুহূর্তেই রাজনীতির গতিপথ ঘুরিয়ে দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে প্রচারিত একটি আপত্তিকর পোস্ট সেই বাস্তবতাকেই আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

ঘটনাটি নিছক একটিহ্যাকিংইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি দ্রুত রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক, নৈতিক প্রশ্ন, নারীর সম্মান, রাষ্ট্রের ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারের বৃহত্তর আলোচনায়। একদিকে জামায়াত দাবি করছেঅ্যাকাউন্ট ডিভাইস হ্যাক করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই পোস্ট দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রশ্ন তুলছেহ্যাকের দাবি করতে এত দেরি কেন? এই দ্বন্দ্বই প্রমাণ করে, ডিজিটাল রাজনীতির মাঠে বিশ্বাসযোগ্যতা এখন সবচেয়ে বড় মূলধন।

সোশ্যাল মিডিয়ার বড় শক্তি হলো এর তাৎক্ষণিকতা। একটি পোস্ট দেওয়া যেমন সেকেন্ডের ব্যাপার, তেমনি সেটির প্রতিক্রিয়াও আসে মুহূর্তে মুহূর্তে। ডা. শফিকুর রহমানের অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া ওই পোস্টটি প্রকাশের পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা সামাজিক মাধ্যমে আগুনের মতো ছড়িয়ে যায়, তৈরি হয় ক্ষোভ, প্রতিবাদ বিক্ষোভ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝাড়ু মিছিল থেকে শুরু করে ছাত্রদলের বিক্ষোভসবকিছুই ঘটেছে ডিজিটাল ক্ষোভের বাস্তব রূপ হিসেবে।

এখানেই সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় বিপদ। একবার কোনো কনটেন্ট ভাইরাল হলে, পরে সেটি সত্য না মিথ্যাসে বিতর্ক অনেক সময় গুরুত্ব হারায়। মানুষের মনে প্রথম যে ইমপ্রেশন তৈরি হয়, সেটিই দীর্ঘস্থায়ী হয়। জামায়াত পরে দুঃখ প্রকাশ করেছে, ক্ষমা চেয়েছে, এমনকি থানায় জিডিও করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়রাজনীতিতেড্যামেজ কন্ট্রোলকি আর সম্ভব থাকে, যখন ডিজিটাল জনমত ইতোমধ্যেই গঠিত হয়ে যায়?

এই ঘটনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোনারী প্রশ্ন। বাংলাদেশের সমাজে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে সংবেদনশীলতা নতুন কিছু নয়। রাজনীতিতে নারীবিদ্বেষী বক্তব্য বরাবরই তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। ফলে পোস্টটি হ্যাকিংয়ের ফল হোক বা না হোক, সেটি নারীদের সম্মান স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। বিএনপি এই সুযোগে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেনারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সমঅধিকারের পক্ষে থাকার কথা জোর দিয়ে বলেছে। রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়া যে কেবল বার্তা দেওয়ার জায়গা নয়, বরং প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার কার্যকর হাতিয়ারএই ঘটনায় সেটিও স্পষ্ট।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে বঙ্গভবনকে ঘিরে। রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একটি সরকারি -মেইল ব্যবহার করে ডিভাইস হ্যাকের অভিযোগ নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। যদি সত্যিই কোনো সরকারি -মেইল বা সিস্টেম অপব্যবহার হয়ে থাকে, তবে তা শুধু একটি দলের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত। বঙ্গভবন কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছেএটি ইতিবাচক। তবে এই তদন্তের ফলাফল কতটা স্বচ্ছভাবে জনসমক্ষে আসে, সেটিই ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। নির্বাচন মানেই এখন আর শুধু মিটিং-মিছিল, পোস্টার-ব্যানার নয়। নির্বাচন মানে ডিজিটাল ক্যাম্পেইন, ট্রোল আর্মি, বট অ্যাকাউন্ট, হ্যাকিং, ফেক নিউজ ইনফরমেশন ওয়ার। যে দল এই ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে, জনমত গঠনে তারাই বাড়তি সুবিধা পাবে। কিন্তু একই সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়বে বহুগুণ।

এর আগে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডাকসু নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বরগুনা জেলা শাখার এক নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. শামীম আহসান নির্বাচনী জনসভায় ডাকসু নিয়ে বলেন, ‘আমরা দেখছি, ডাকসু নির্বাচনের পরে-যে ডাকসু মাদকের আড্ডা ছিল, যে ডাকসু বেশ্যাখানা ছিল- সেটা ইসলামী ছাত্রশিবির পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হলে গত ২৭ জানুয়ারি ঘটনায় জেলা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার রুকন পদ স্থগিত করা হয় এবং সব সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

ডা. শফিকুর রহমানের ঘটনাটিও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি বড় শিক্ষা। ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট মানেই নিরাপদএই ধারণা ভুল। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সাইবার সুরক্ষা এখন সময়ের দাবি। শুধু পাসওয়ার্ড বদলালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; দরকার প্রশিক্ষিত টিম, তাৎক্ষণিক রেসপন্স মেকানিজম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণদ্রুত স্বচ্ছ যোগাযোগ।

সোশ্যাল মিডিয়ার আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এটি আবেগকে যুক্তির চেয়ে দ্রুত ছড়ায়। একটি আপত্তিকর পোস্ট মানুষকে ক্ষুব্ধ করে, কিন্তু পরে তার ব্যাখ্যা বা প্রতিবাদ অনেক সময় সেই ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারে না। ফলে রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা এখন নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, বরং রাজনৈতিক টিকে থাকার প্রশ্ন।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বলা যায়, বাংলাদেশি রাজনীতি একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছেযেখানে একটি টুইট কখনো কখনো একটি মিছিলের চেয়েও শক্তিশালী, একটি স্ক্রিনশট কখনো কখনো একটি ভাষণের চেয়েও প্রভাবশালী। এই শক্তিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই, আবার অন্ধভাবে ব্যবহার করার ঝুঁকিও মারাত্মক।

আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তক ম্যানুয়েল ক্যাস্তেলস (Manuel Castells) তাঁর Networks of Outrage and Hope গ্রন্থে বলেছেন—“Power in the network society is the power of communication.” অর্থাৎ নেটওয়ার্ক সমাজে ক্ষমতার মূল উৎস হলো যোগাযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই কথাই আজ হাড়ে হাড়ে সত্য হয়ে উঠছে। সোশ্যাল মিডিয়া এখন আর কেবল প্রযুক্তি নয়এটি ক্ষমতা, সংকট এবং সম্ভাবনার একসঙ্গে উপস্থিত থাকা এক নতুন বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, রাজনীতিকরা কি এই বাস্তবতার জন্য সত্যিই প্রস্তুত?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক কলামিস্ট

You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?

আমাদের অনুসরণ করুন

জনপ্রিয় বিভাগ

সাম্প্রতিক মন্তব্য