বাংলাদেশ ও ভারত এর মধ্যে চলমান তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য একটি সম্ভাব্য ‘সমঝোতার জানালা’ খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক Michael Kugelman।
অনলাইন সাময়িকী Foreign Policy তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে Atlantic Council এর এই সিনিয়র ফেলো লিখেছেন, দীর্ঘদিনের তিক্ততা সত্ত্বেও দিল্লি এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য সরকারের প্রতি নতুন ধরনের ইতিবাচক বার্তা দিতে শুরু করেছে।
বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদীর শোকবার্তা এবং ঢাকায় জানাজায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী S Jaishankar এর উপস্থিতিকে দিল্লির কৌশলগত অবস্থান বদলের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন কুগেলম্যান। তার মতে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের জোট ভেঙে বেরিয়ে আসায় বিএনপি এখন ভারতের কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকেই ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে অবনতি শুরু হয়, যার প্রভাব পড়ে ক্রীড়াঙ্গনেও। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি Indian Premier League (আইপিএল) এর সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে এবং জাতীয় দল ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে।
কুগেলম্যানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একদিকে অনেক বাংলাদেশি মনে করেন ভারত দীর্ঘদিন ধরে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে ভারতের ধারণা, হাসিনাবিহীন বাংলাদেশে কট্টরপন্থীদের উত্থান ঘটছে। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাকে হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানানো দিল্লির অবস্থানকে আরও কঠোর করেছে বিশেষ করে যখন বাংলাদেশি আদালত তার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও সম্পর্ক উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। বাংলাদেশে প্রভাবশালী ইসলামপন্থী দলগুলোর একটি অংশ ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিরোধী, যা নতুন সরকারের কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত করতে পারে। অন্যদিকে, ভারতে সংখ্যালঘু ইস্যু এবং বাংলাদেশে কিছু মানবাধিকারকর্মীর ওপর হামলার ঘটনা দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সতর্ক করে তুলেছে।
তবে কুগেলম্যান মনে করেন, সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে Tarique Rahman এর জাতীয় ঐক্যের ডাক এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিল্লিকে কিছুটা আশাবাদী করছে। একইভাবে বিএনপি মহাসচিব Mirza Fakhrul Islam Alamgir এর ‘সমঅধিকারভিত্তিক সম্পর্ক’–এর অবস্থানও ভারতের নজরে এসেছে।
সবশেষে কুগেলম্যানের মূল্যায়ন হলো, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের বরফ গলানোর একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে তা তখনই সম্ভব হবে, যখন উভয় পক্ষ রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে বাস্তবমুখী আপসে প্রস্তুত হবে। ভারত ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা বাংলাদেশে নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
ফলে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দিল্লি ও ঢাকার পরবর্তী নেতৃত্বের কূটনৈতিক সাহস, বাস্তববাদ এবং দুই দেশের সাধারণ মানুষের আবেগ ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সমন্বয় করার সক্ষমতার ওপর।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?