গণভোট গণতন্ত্রে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলেও এর বৈধতা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা অনুযায়ী, গণভোটকে হতে হয় স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের অধীন ভেনিস কমিশন তার গণভোটে উত্তম চর্চার নির্দেশিকায় (কোড অব গুড প্র্যাকটিস অন রেফারেন্ডামস) (২০০৭; সংশোধিত ২০২২) জোর দিয়ে বলেছে, ভোটারদের অবহিত সম্মতি নিশ্চিত করতে গণভোটের কাঠামো এমন হতে হবে, যাতে নাগরিকরা প্রকৃত অর্থে বুঝতে পারে– তারা কোন পরিবর্তনের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। কমিশন একই সঙ্গে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, প্রচারণায় সমান সুযোগ এবং সংখ্যালঘু ও নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।
আন্তর্জাতিক
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (আইসিসিপিআর, ১৯৬৬) ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ নাগরিকদের
রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশগ্রহণের অধিকার স্বীকার করে। জাতিসংঘ মানবাধিকার
কমিটির জেনারেল কমেন্ট নম্বর ২৫ (১৯৯৬) এই অধিকার কার্যকর করতে নির্বাচনী
প্রক্রিয়া ও গণভোটে স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং প্রকৃত পছন্দের সুযোগ নিশ্চিত করার
প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
এই আন্তর্জাতিক নীতিমালা সম্মিলিতভাবে একটি মূল নীতিই স্পষ্ট করে– গণভোট কোনো সংখ্যাগত অনুশীলন নয়। এটি নাগরিক
আস্থা, অবহিত সম্মতি এবং প্রক্রিয়াগত ন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি নৈতিক অঙ্গীকার।
দেশভিত্তিক অভিজ্ঞতাও এই কাঠামোকে শক্তিশালী করে। সুইজারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রস্তাব আলাদাভাবে ভোটে তোলা হয়, যা ভোটারদের প্রকৃত পছন্দ প্রতিফলিত করতে সহায়তা করে। বিপরীতে, কুইবেক ও কাতালোনিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, অন্তর্ভুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্য ছাড়া গণভোট রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও গভীর করতে পারে।
বাংলাদেশের গণভোট: মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বাস্তবতা
ওপরের আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলাদেশের আসন্ন গণভোটের কাঠামো আন্তর্জাতিকভাবে
স্বীকৃত গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে একটি গভীর ও কাঠামোগত সংঘাত সৃষ্টি করছে।
ভোটারদের সামনে একযোগে যে চারটি বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো কেবল প্রশাসনিক
বা কারিগরি সংস্কার নয়; বরং রাষ্ট্রক্ষমতার বণ্টন, প্রতিনিধিত্বের ধরন এবং নাগরিক
অধিকারের দর্শনকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। এসবের মধ্যে রয়েছে– নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকার ও সাংবিধানিক
সংস্থাগুলোর পুনর্গঠন, একটি উচ্চকক্ষসহ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তন, নির্বাহী ও
সংসদীয় ক্ষমতার পুনর্বণ্টন (যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা ও রাষ্ট্রপতির
ক্ষমতা বৃদ্ধি অন্তর্ভুক্ত) এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নারীর প্রতিনিধিত্ব,
স্থানীয় সরকার ও মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত বিস্তৃত সংস্কার।
এই চারটি প্রস্তাব ধারণাগতভাবে পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র। কেয়ারটেকার সরকার প্রশ্নটি নির্বাচনী বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত; দ্বিকক্ষ সংসদ প্রতিনিধিত্ব ও আইন প্রণয়ন কাঠামোর পরিবর্তন ঘটায়; নির্বাহী ক্ষমতার পুনর্বণ্টন রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভারসাম্যকে পুনর্নির্ধারণ করে। আর বিচার বিভাগ ও মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত সংস্কার আইনের শাসন ও নাগরিক স্বাধীনতার কেন্দ্রীয় ভিত্তিকে স্পর্শ করে। এত ভিন্নমাত্রিক বিষয়কে একত্রে একটি ‘প্যাকেজ’ হিসেবে ভোটে তোলা মানে ভোটারদের পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের সুযোগ কার্যত অস্বীকার করা।
ভেনিস কমিশনের ওপরে বর্ণিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, এ ধরনের প্যাকেজ গণভোটের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। কারণ এতে ভোটারদের অবহিত সম্মতির (ইনফর্মড কনসেন্ট) সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। একজন ভোটার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদারের পক্ষে থাকতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেন; আবার দ্বিকক্ষ সংসদ সমর্থন করলেও কেয়ারটেকার সরকারের প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। একক ‘হ্যাঁ/না’ বিকল্প এসব গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যকে মুছে দেয় এবং গণভোটকে নীতিগত পছন্দের বদলে একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক আনুগত্য পরীক্ষায় পরিণত করে।
জটিল ও
বহুমাত্রিক সাংবিধানিক সংস্কারগুলো পৃথকভাবে বোঝা, বিতর্ক করা ও বিচার করার সুযোগ
না থাকলে ভোটারদের সম্মতি আর প্রকৃত অর্থে অবহিত থাকে না। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
দেখায়, এমন পরিস্থিতিতে গণভোটের ফল সংখ্যাগতভাবে বৈধ মনে হলেও নৈতিক ও গণতান্ত্রিক
দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে বৈধতার সংকটের জন্ম দেয়।
একই সঙ্গে একক প্রশ্নে বিস্তৃত সংস্কার প্যাকেজ উপস্থাপন ক্ষমতার অসম বণ্টনের
ঝুঁকি বাড়ায়। জনপ্রিয় বা তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য সংস্কারের আড়ালে বিতর্কিত ও
ক্ষমতাকেন্দ্রিক পরিবর্তন অনুমোদনের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে গণভোট নাগরিক ক্ষমতায়নের
মাধ্যম না হয়ে সাংবিধানিক পরিবর্তনের একটি রাজনৈতিক শর্টকাটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা
দেখা দেয়।
এই কাঠামোগত সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার একটি গুরুতর সংকট। সরকার একদিকে প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, অন্যদিকে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা– যারা নির্বাহী শাখার অধীন আমলা– একই সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে গণভোট পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। এতে রাষ্ট্র কার্যত একই সঙ্গে পক্ষ ও বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে, যা গণভোটের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মৌলিকভাবে ক্ষয় করে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গণভোটে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং প্রচারণায় সব পক্ষের জন্য সমান সুযোগ অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় ‘না’ ভোটের পক্ষে থাকা নাগরিক ও গোষ্ঠীগুলো কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে পড়ছে। ফলে প্রক্রিয়ার প্রতি জনআস্থা দুর্বল হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসও এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দেয়। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের গণভোটে প্রায় ৯৮ শতাংশ এবং ১৯৮৫ সালে এরশাদের গণভোটে ৯৪ শতাংশ সমর্থন দেখানো হলেও এই অস্বাভাবিক ফল শেষ পর্যন্ত বৈধতার সংকটই তৈরি করেছিল।
আইনি অনুমোদন থাকলেও নৈতিক বৈধতা অপরিহার্য
জন লক, রুশো ও জন রলসের রাজনৈতিক দর্শনে বৈধতার উৎস আইনগত ক্ষমতা নয়; বরং অবহিত
সম্মতি, ন্যায়সংগত প্রতিযোগিতা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশ। রাষ্ট্র যখন পক্ষ হয়ে ওঠে,
তখন এই মৌলিক নৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়ে। গণভোট কেবল আইনের অক্ষরে নয়, নাগরিক আস্থা ও
প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই আস্থাই এখানে সবচেয়ে বেশি
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে গণভোট গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে
তার দুর্বলতাই উন্মোচিত করে।
যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিটকে উদাহরণ হিসেবে আনা বিভ্রান্তিকর। কারণ সেখানে সরকার রাজনৈতিক অবস্থান নিলেও প্রশাসনিক কাঠামো ছিল নিরপেক্ষ এবং ভোটারদের সামনে প্রশ্ন ছিল একক ও স্পষ্ট । অন্যদিকে বাংলাদেশে সরকার শুধু প্রচারণাতেই সক্রিয় নয়, বরং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণও নিজের হাতে রেখেছে। এর ফলে অবহিত সম্মতি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ভঙ্গ হচ্ছে এবং গণভোটের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। উপরন্তু ব্রেক্সিট গণভোট আইনি বৈধতা পেলেও স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে তৈরি করে আস্থার সংকট। কানাডার কুইবেক গণভোটে অল্প ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করে।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
অব বিজনেস, এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?
ড. গোলাম রসুল