ছবির ছেলেটির নাম জাহিদ। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছিল কানাডায়। শুক্রবার, বাদ জুম্মা তার জানাজা। জাহিদের সঙ্গে আমার কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। এমনকি জানাজার নামাজে যারা অংশ নেবেন, তাদের অনেকেই হয়তো তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না। তবু এমন একটি তাজা প্রাণের ঝরে যাওয়া ভাবতেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।
একটু ভিন্নভাবে ভাবলে বিষয়টি আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। সদ্য এইচএসসি বা দ্বাদশ শ্রেণি পাস করা একজন ছেলে বা মেয়ের বয়স সাধারণত ১৭–১৮ বছর। এই বয়সে তার কাজ হওয়ার কথা পড়াশোনা করা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা। এ বয়সে কি আমরা আমাদের সন্তানকে ঘরের সব কাজ, রান্না, বিল পরিশোধ, নিজের খরচ নিজে চালানো, অসুস্থ অবস্থাতেও নিজের যত্ন নিজে নেওয়ার দায়িত্ব চাপিয়ে দিই? উত্তরটা সবারই জানা—না।
অথচ আমরা অভিভাবকেরা অনেক সময় নিশ্চিন্ত মনে এই বয়সের ছেলেমেয়েদের বিদেশে পাঠিয়ে দিই। বাইরে থেকে মনে হয়, ‘যাক, এবার একটা গতি হলো।’ কিন্তু বাস্তবে এই বাচ্চারাই জানে, হঠাৎ করে একা পড়ে গিয়ে কীভাবে অথই সাগরে হাবুডুবু খেতে হয়। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর বাসায় ফিরে নিজের রান্না নিজেকেই করতে হয়, কখনো না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তে হয়। কারও পরদিন পরীক্ষা, রাত জেগে পড়তে হবে—পেটে ক্ষুধা নিয়েই। ঈদের দিন পরিবারে উৎসব, আর ওরা হয় ক্লাসে, নয়তো কাজে—ছুটির সুযোগটুকুও মেলে না।
অসুখ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বাবা–মায়ের প্রত্যাশা থাকে—বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছি, অত টাকা দিতে পারব না। ফলে থাকা–খাওয়া, টিউশন ফি, ফোন বিল, ক্রেডিট কার্ড—সব চিন্তা ওই অল্প বয়সী মাথার ওপরই পড়ে। তাই নিজের খাবার না থাকলেও অন্যের জন্য গরম খাবারের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দরজা থেকে দরজায় ছুটে বেড়াতে হয় ফুড ডেলিভারিতে—অল্প কিছু ডলারের আশায়।
এই বয়সে আরও থাকে নানা হাতছানি। হাত বাড়ালেই সহজলভ্য নেশাদ্রব্য। গত মাসেই মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় এক বাংলাদেশি ছাত্রকে উদ্ধার করে দেশে ফেরত পাঠাতে হয়েছে। দোষারোপ করার সুযোগ নেই—এই বয়সে সব সামলে যারা ঠিক পথে থাকে, তারা সত্যিই সংগ্রামী।
গত পাঁচ বছরে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া মাঝপথে ছেড়ে ডিপ্লোমায় চলে যায়। অনেকেই বলেন, ‘সেটেলড হলেই হলো।’ কিন্তু এতে কত সম্ভাবনা যে অঙ্কুরেই ঝরে যায়, তা আমরা বুঝি না। তাই আমি সবসময় মনে করি—ব্যাচেলর ডিগ্রিটা অন্তত দেশে শেষ করে, একটু পরিণত হয়ে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি নিয়ে বিদেশে যাওয়া উচিত।
এই সব প্রতিকূলতার সঙ্গে যুক্ত হয় একাকীত্ব আর হতাশা। সবাই বন্ধু বানাতে পারে না। জাহিদও পারেনি। কয়েক মাস আগে তার স্টাডি পারমিট ও হেলথ পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। প্রচণ্ড শীতে সে সর্দি–কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। কিন্তু হেলথ পারমিট না থাকায় চিকিৎসকের কাছে যায়নি। একা একা ভুগতে ভুগতে সে ব্রংকাইটিসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। বন্ধুরা হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকেরা জানান—তার ফুসফুস সম্পূর্ণ অকেজো। দুই সপ্তাহ লাইফ সাপোর্টে থাকার পর জাহিদ চলে যায় না–ফেরার দেশে।
শেষ সময়ে পাশে ছিল না বাবা–মা, ভাই–বোন কিংবা আত্মীয়স্বজন। তার মরদেহ দেশে পাঠাতে প্রায় ১৮ হাজার ডলার লাগে, যা বাংলাদেশি কমিউনিটির সহায়তায় ফান্ডরেইজ করে জোগাড় করা হয়েছে। সবাই আন্তরিকভাবে এগিয়ে এসেছে। তবু আফসোস থেকে যায়—এই বাচ্চাটার জন্য অসম্ভব আফসোস।
আল্লাহ জাহিদকে বেহেশত নসিব করুন।
ফেসবুক: https://www.facebook.com/farhana.yasmin.104
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?