২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে গত ২২ জুন। ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ৫.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বাজেটে কাঠামোগত কোনো বড় ধরনের সংস্কারের প্রতিফলন নেই। সরকারের ভাষায় বাজেটটি ‘সংস্কারমুখী’, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এটি সংকট সমাধানের চেয়ে সংকট ব্যবস্থাপনাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বলা হলেও মূল প্রশ্ন রয়ে যায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কি কেবল বাজেটের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উত্তরণ সম্ভব? প্রবাসী আয় বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে—তথ্যগুলো কিছুটা আশাব্যঞ্জক হলেও প্রবাসী আয় মূলত বেড়েছে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল। এটি অর্থনীতির জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত। প্রবাসীরা যখন বৈধ পথকে এড়িয়ে হুন্ডিকে বেছে নিচ্ছেন, তখন বুঝতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতি আস্থার ঘাটতি কতটা প্রকট। অন্যদিকে, বাজেটের কাঠামোয় এবারও আমরা সুশাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাঙ্ক্ষিত কোনো পরিবর্তন দেখতে পাইনি। অথচ এসব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও কাঠামোগত সংস্কারে বাস্তব অগ্রগতি হতাশাজনক। সংস্কার রূপরেখা প্রণয়ন এবং কমিশন গঠনের ঘোষণাগুলো যেন কেবল কাগজেই রয়ে গেছে। প্রয়োগে নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ, নেই জনআস্থা কিংবা স্বচ্ছতা।
সংস্কারের নামে যে ক’টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো নিয়েও রয়েছে অংশগ্রহণের অভাব ও স্পষ্ট দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। বিশেষত, সরকারি চাকরি আইন সংশোধনকে ঘিরে আমলাতন্ত্রে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ের খসড়া অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার বাইরে রেখে চূড়ান্ত করায় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এখানে মনে রাখতে হবে, সংস্কার মানে শুধু আইন তৈরি নয় এটি হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বিশ্বাসযোগ্য এবং জনসম্পৃক্ত। গণশুনানি, তথ্য উন্মুক্তকরণ এবং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা এসব মৌলিক দিক একেবারেই অনুপস্থিত। সবচেয়ে হতাশাজনক হলো, শিক্ষা খাতের মতো মৌলিক ও ভবিষ্যত-নির্ধারক বিষয়ে সরকার এখনও পর্যন্ত কোনো সংস্কার পরিকল্পনাই উপস্থাপন করেনি। অথচ শিক্ষা ছাড়া ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার যে স্বপ্ন, তা বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনার ব্যবধানেই থেকে যাচ্ছে। এ ধরনের সংস্কারহীন ও সংবেদনশীলতাহীন দৃষ্টিভঙ্গি কেবলই সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা খর্ব করে না, বরং জনগণের আস্থা হ্রাস করে, নীতি বাস্তবায়নের ক্ষমতাকেও দুর্বল করে দেয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চিত্রও উদ্বেগজনক। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অব্যাহত পতন, বিনিয়োগ ও রপ্তানির স্থবিরতা, এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মিলিয়ে অর্থনীতির উপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। তবে এসব আর্থিক সংকটের গভীরে যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে, তা অবশেষে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর রিপোর্টেও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই অর্থনৈতিক স্থবিরতার অন্যতম মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে মাত্র ৩.৮ শতাংশে যা দেশের উচ্চ জনসংখ্যার প্রেক্ষাপটে স্পষ্টতই হতাশাজনক। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দারিদ্র্যের হার ২০২৫ সালে দাঁড়াতে পারে ২২.৯ শতাংশে, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩০ লাখে গিয়ে ঠেকতে পারে একটি ভয়াবহ বাস্তবতা, যাকে আর শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো চলে না।
অর্থনৈতিক সমস্যা যেভাবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ধারাবাহিকতায় প্রকট হয়েছে, তাতে এই সংকট আর নিছক আর্থিক নয়। উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশের বাজার নিয়ে আগ্রহ হারাচ্ছেন, কারণ এখানে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা নেই। অথচ, একটি টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলার পূর্বশর্তই হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যথার্থই বলেছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ স্থবিরতার অন্যতম কারণ। এক্ষেত্রে শুধু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য নয়, দেশের সাধারণ মানুষও অর্থনীতির এই দুরবস্থা চোখে দেখছেন, ভোগ করছেন। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, চিকিৎসা ও শিক্ষা খরচ বেড়ে যাওয়া, আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা সবই প্রমাণ করে যে সংকটটি বাস্তব এবং বর্তমান। আইএমএফ রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রিজার্ভ পুনর্গঠন, ভর্তুকি কমানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গঠনমূলক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। তবে এই পরামর্শ কার্যকর হবে না, যদি রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূল না হয়। কারণ, অর্থনৈতিক সংস্কার শুধু কারিগরি নয় এটি রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির বিষয়।
সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ নির্মাণের কথা বলছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের পরবর্তী পর্যায়ে উন্নয়নের রূপরেখা উপস্থাপিত হচ্ছে নানা রঙিন ভাষায়। কিন্তু বাস্তবতার কণ্ঠস্বর একেবারেই ভিন্ন। আজকের যে গভীর সংকট, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে আমানতকারীদের আস্থার ঘাটতি, কর কাঠামোয় বৈষম্য, এবং লাগামহীন দুর্নীতি এসবের কোনো কার্যকর মোকাবিলা আমাদের চোখে পড়ছে না। কালো টাকা সাদা করার সুবিধা বন্ধ করা হলেও দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রমে সেই সাহসিকতা বা তৎপরতা অনুপস্থিত। বরং দুর্নীতিবাজদের জবাবদিহির বাইরেই থেকে যেতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, ‘সরকারি চাকরি সংশোধনী আইন ২০২৪’ নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা কেবল আমলাতন্ত্রকে আরও রক্ষণশীল এবং আত্মরক্ষামূলক করে তুলছে। এই ধারা সংস্কার প্রক্রিয়াকে শুধু মন্থরই করবে না, বরং জনগণের আস্থাও ক্ষুণ্ন করবে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত হলো স্থানীয় সরকার যার বিকেন্দ্রীকরণ ও শক্তিশালীকরণের প্রতিশ্রুতি বহুদিনের। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি বরাদ্দ, ক্ষমতার কাঠামো বা স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হচ্ছে না। গণতন্ত্রের শিকড় যদি তৃণমূলে না পৌঁছায়, তবে উন্নয়ন কাগুজে পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংলাপ ছিল একটি বড় প্রত্যাশার জায়গা। সংলাপ শুরুর সময় বলা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার একটি গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক রূপরেখা দেবে। কিন্তু আট মাস পরও ১৬৬টি প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র ৪২টিতে ‘সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি’র কথা বলা হচ্ছে। অনেক প্রস্তাব এখনও কমিটি বা খসড়া পর্যায়েই আটকে আছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে এই সংলাপ কী সত্যিকারের সংস্কারের পথে অগ্রগতি, নাকি শুধুই সময়ক্ষেপণের কৌশল? তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে স্পর্শকাতর ইস্যুটি হলো রাজনৈতিক বৈধতা। অর্থনৈতিক কোনো সংস্কারই কার্যকর হতে পারে না যদি তা একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল ও গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে না হয়। যে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা নেই, অংশগ্রহণ নেই, জবাবদিহির সুযোগ নেই সেখানে উন্নয়ন টেকসই হয় না। রাজনৈতিক অস্থিরতা কেবল বিনিয়োগে বাধা তৈরি করে না, জনজীবনেও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে দেয়।
আমরা মনে করি, সরকার এবং সব রাজনৈতিক পক্ষের উচিত এখনই অনমনীয়তা ও আস্থাহীনতার দেয়াল ভেঙে সমঝোতার পথে এগিয়ে যাওয়া। ‘নিজ অবস্থানে অনড় থাকা’ মানেই ঐকমত্যকে অস্বীকার করা। এই সরল সত্যটি সকল রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানা উচিত। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন কেবল পরিসংখ্যান নয়, তা ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক বার্তা। এই সংকেতকে গুরুত্ব না দিলে উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবতা থেকে বহু দূরে সরে যাবে। শান্তি ও স্থিতির পথে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, তা আজ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। কেননা, অর্থনৈতিক উত্তরণের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই। রাষ্ট্রীয় সংস্কার কোনো একক দলের কর্মসূচি নয়, এটি হতে হবে সর্বদলীয় সর্বসম্মত জাতীয় অঙ্গীকার। আমরা ‘জাতীয় সনদ’ তৈরির উদ্যোগকে স্বাগত জানাই, তবে সেটি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা প্রকৃত অর্থেই সব পক্ষের মতামতের প্রতিফলন ঘটাবে। অন্যথায়, এটি সাধারণ মানুষের চোখে ‘জাতীয়’ না হয়ে রাজনৈতিক কৌশলের দলিল হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব আরও বেশি হয়ে ওঠে। সরকারের উচিত হবে রাজনৈতিক বিভাজনকে নয়, সংলাপকে প্রাধান্য দিয়ে সবাইকে আস্থায় আনা। মতপার্থক্যকে দমন না করে বরং আলোচনার রসদ হিসেবে বিবেচনা করাই হবে একটি পরিণত গণতান্ত্রিক চর্চার দৃষ্টান্ত। ‘জাতীয় ঐকমত্য’ রাতারাতি গড়ে ওঠে না। এতে সময়, সহনশীলতা, এবং সবচেয়ে বড় যে জিনিসটি দরকার তা হলো একে অপরকে গ্রহণ করার মানসিকতা। যদি কোনো পক্ষ নিজেকে বাদ রেখে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়তে চায়, তবে সেটি হবে দলীয় ঐক্য, জাতীয় নয়। দেশের স্বার্থেই রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে ন্যূনতম ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
বাংলাদেশ এখন একটি দ্বিধাদ্বন্দ্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংলাপ এবং জাতীয় স্বার্থে একযোগে কাজ করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা—এ মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে জরুরি। অর্থনীতি আর সময় দিচ্ছে না; রাজনৈতিক দলগুলো যদি এখনও ন্যূনতম ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারে, তবে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল বাংলাদেশের রাজনীতি আর সংস্কার প্রশ্নে গড়িমসি না করে বাস্তব পদক্ষেপে অগ্রসর হোক। দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সংকটগুলোর শেষ হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর সমাধানে। আর সে কাজ শুরু হোক এখনই এই সরকারের হাত ধরেই এটাই আপামর জনসাধারণের প্রত্যাশা। কারণ, শেষ ভালো যার, সব ভালো তার।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?