clock ,

শীর্ষ ঝুঁকির তালিকায় বাংলাদেশ: বৈশ্বিক অনলাইন প্রতারণা দমনে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর পদক্ষেপ

শীর্ষ ঝুঁকির তালিকায় বাংলাদেশ: বৈশ্বিক অনলাইন প্রতারণা দমনে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর পদক্ষেপ

অনলাইন প্রতারণা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং এটি একটি বৈশ্বিক অপরাধ শিল্পে পরিণত হয়েছে। স্মার্টফোনে হঠাৎ কল কখনো আইআরএস বা ইমিগ্রেশন অফিসের পরিচয়ে, কখনো বিনা মূল্যে সোলার প্যানেল বসানোর প্রলোভন, আবার কখনো নগদে বাড়ি কেনার প্রস্তাব। এসব স্ক্যাম কলের বড় একটি অংশ এখন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ এবং আফ্রিকার কিছু অঞ্চলকে বর্তমানে অনলাইন স্ক্যাম কার্যক্রমের উচ্চঝুঁকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় কল সিস্টেম এবং ডিজিটাল টুলের অপব্যবহারের মাধ্যমে এসব চক্র আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত, জটিল সীমান্তছাড়া প্রতারণা চালাচ্ছে।

উদ্বেগজনকভাবে, বাংলাদেশে বসে পরিচালিত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন শুধু স্থানীয় নাগরিক নয় মার্কিন নাগরিকরাও। সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে মার্কিন পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভুয়া ব্যবসা পরিচালনার একটি জালিয়াতি চক্র শনাক্ত হওয়ার পর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একই সঙ্গে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশে সক্রিয় সাইবার অপরাধী নেটওয়ার্ক ব্যক্তি পর্যায়ের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানকেও টার্গেট করছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই অনলাইন প্রতারণাজনিত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ দশমিক বিলিয়ন ডলার বিশ্বব্যাপী এই ক্ষতির অঙ্ক ৬৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জরিপ বলছে, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মার্কিন নাগরিক জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনলাইন প্রতারণার মুখোমুখি হয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অপরাধ আর কোনো একক দেশ বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আফ্রিকার কিছু দেশে গড়ে ওঠা বৃহৎ স্ক্যাম সেন্টার থেকে বিশ্বজুড়ে মানুষকে লক্ষ্য করে অর্থ সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নথিতে লাওসসহ কয়েকটি দেশে মানব পাচারের মাধ্যমে মানুষকে আটকে রেখে সাইবার অপরাধে বাধ্য করার তথ্যও উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চিত্রটি উদ্বেগজনক। ঢাকার বাইরেও বসে সংগঠিত চক্রগুলো নিয়মিতভাবে ফোন স্ক্যামসহ নানা প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লক্ষ্য করছে। প্রতারণার ঘটনা নিয়মিত প্রকাশ্যে এলেও কার্যকর আইনি প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক সমন্বয় এখনো সীমিত।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রতারণা থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ মাদক পাচার, অস্ত্র ব্যবসা মানব পাচারের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত এক লাখেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এসব আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত বা এর প্রভাবে রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে অনলাইন প্রতারণা আন্তর্জাতিক স্ক্যাম চক্র দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে নিবন্ধিত এইচ.আর. ৫৪৯০ নম্বর বিলটি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর বিবেচনায় রয়েছে এবং দলমত নির্বিশেষে এর প্রতি ব্যাপক সমর্থন দেখা যাচ্ছে।

প্রস্তাবিত আইনের লক্ষ্য হলো বিদেশভিত্তিক সংগঠিত প্রতারণা চক্র শনাক্ত করা, তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করা এবং অনলাইন অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। আইনটি কার্যকর হলে পররাষ্ট্র, বিচার, অর্থ, স্বরাষ্ট্র যোগাযোগসংক্রান্ত সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থাগত টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। এই কাঠামোর আওতায় সন্দেহভাজনদের শনাক্ত, অর্থের উৎস অনুসরণ, নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা বাড়বে।

আইনটিতে মানব পাচারের শিকার হয়ে প্রতারণা কেন্দ্রে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কমিটির পর্যালোচনা শেষে বিলটি প্রতিনিধি পরিষদ সিনেটে পাস হলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু আর্থিক ক্ষতি কমানো নয় আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেটগুলোর কাঠামোগত শক্তিও দুর্বল করা সম্ভব হবে। অনলাইন প্রতারণা এখন ব্যক্তি, পরিবার রাষ্ট্র সব পর্যায়েই একটি গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি। বাংলাদেশসহ যেসব দেশ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে, সেখানে দৃঢ় আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই অপরাধচক্র ভাঙা কঠিনএই সতর্কবার্তাই এখন সবচেয়ে জোরালো।

 

You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?

আমাদের অনুসরণ করুন

জনপ্রিয় বিভাগ

সাম্প্রতিক মন্তব্য