clock ,

ড. ইউনূসের সরকার কি ভূরাজনৈতিক?

ড. ইউনূসের সরকার কি ভূরাজনৈতিক?

শেষ মুহূর্তেও অন্তর্বর্তী সরকার একের পর এক চুক্তিতে সই করছে, যার অধিকাংশই ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। বিশ্লেষকদের মতে, সংস্কারই যেখানে মূল ম্যান্ডেট ছিল, সেখানে ধরনের তৎপরতা এতটাই প্রাধান্য পেয়েছে যে গণ-অভ্যুত্থানের সরকারভূরাজনৈতিক সরকারেরূপ নিয়েছে

মাত্র পাঁচদিন পর জাতীয় নির্বাচন। ঠিক সময়ে প্রধান উপদেষ্টা . মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার একের পর এক আন্তর্জাতিক চুক্তি সমঝোতা স্মারকে সই করছে। যার মধ্যে রয়েছে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রযুক্তি হস্তান্তরবিষয়ক চুক্তি সই। নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্কসংক্রান্ত বাণিজ্য চুক্তিও সই করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। বন্দরসংশ্লিষ্টদের আপত্তি বাধা উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ছেড়ে দেয়ার প্রক্রিয়াও অনেকখানি এগিয়েছে। এর বাইরে গত নভেম্বরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি করে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশ্লিষ্ট একাধিক চুক্তিতে নন-ডিসক্লোজার (গোপনীয়তা) ক্লজ থাকায় চুক্তির শর্তাবলি পারস্পরিক দায়দায়িত্বের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়া নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর প্রতিরক্ষা খাতেও একাধিক বড় উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের সঙ্গে জিটুজি চুক্তিতে ড্রোন কারখানা স্থাপন, জে১০ সিই যুদ্ধবিমান ক্রয়, পাকিস্তান থেকে জেএফ১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান, ইউরোপীয় কনসোর্টিয়াম থেকে ইউরোফাইটার টাইফুন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্ল্যাক হক মাল্টিরোল হেলিকপ্টার ক্রয়ের প্রসঙ্গ।

বিশ্লেষকদের মতে, তফসিল ঘোষণার পর একটি সরকারের প্রধান দায়িত্ব নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সম্পন্নের জন্য প্রশাসনকে প্রস্তুত করা। বিশেষ করে দেশ যখন ১৬ বছর পর আবার ভোট উৎসবে অংশ নিতে যাচ্ছে, তখন নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে সরকারের মনোযোগ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া একটি সরকারের সময় রুটিন দায়িত্ব প্রশাসনিক কাজ পর্যন্ত সীমিত রাখা।

তারা বলছেন, সুষ্ঠু ভোট গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়াই যেখানে সরকারের মূল ম্যান্ডেট ছিল, সেখানে চুক্তিসংক্রান্ত তৎপরতা এতটাই প্রাধান্য পেয়েছে যে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারভূরাজনৈতিক সরকারেরূপ নিয়েছে। বিশেষ করে যখন এসব কৌশলগত সিদ্ধান্তের অনেকগুলোই দীর্ঘমেয়াদি এবং ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের নীতিগত পরিসর সংকুচিত করতে পারে।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের নেতৃত্বে আসে . মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। জন-আকাঙ্ক্ষা ছিল স্পষ্টদীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর রাষ্ট্রকে আবার গণতান্ত্রিক পথে ফেরানো, দুর্নীতির পুরনো নেটওয়ার্ক ভাঙা, পুলিশ আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করাসহ রাষ্ট্র পুনর্গঠন। বলা যায়, রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করাই ছিল সরকারের মূল ম্যান্ডেট। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর কয়েক মাসে সরকারের সবচেয়ে সক্রিয়, দ্রুত দৃশ্যমান সিদ্ধান্তগুলো এসেছে এমন সব খাতে, যেগুলো রাজনৈতিক সংস্কারের চেয়ে বেশি ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরই যেসব সিদ্ধান্ত উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, সেগুলোর বড় অংশই ঘুরপাক খেয়েছে বন্দর, টার্মিনাল, জ্বালানি, বিদেশী বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা দীর্ঘমেয়াদি এবং কৌশলগত আন্তর্জাতিক চুক্তি, কৌশলগত অবকাঠামো সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিছক প্রশাসনিক বা উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্ত নয়। এগুলো স্পষ্টভাবেই ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বিপরীতে যেসব সংস্কার ছিল সরকারের কাছে মূল প্রত্যাশা, সেগুলোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি একেবারেই সীমিত।

অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রেদ্বিমুখী নীতিবা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড দেখা গেছে বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যের রেডিং বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর . এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল বরাদ্দের মতো বৈদেশিক চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে এক বিশেষ তৎপরতা দেখা গেছে তাদের। অথচ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সাধারণত একটি নির্বাচিত সংসদের এখতিয়ারভুক্ত হওয়া উচিত। এর বিপরীতে জনসমর্থনপুষ্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিষয়গুলোকে প্রায়ই একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে অথবা ধীরগতিতে পরিচালনা করা হয়েছে।

বৈদেশিক চুক্তিগুলোর অনেকগুলোরই গভীর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে জানিয়ে নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, ‘জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকগুলো একটি নির্দিষ্ট কৌশলগত সারিবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চলমান আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় জাপান ক্রমাগত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর গতি ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে কার্যকরভাবে এমন একটিমাল্টিলেয়ার কানেক্টিভিটিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা মূলত চীনেরবেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ”-এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। অন্তর্বর্তী সরকারকে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক রোডম্যাপ তৈরি করতে দেখা গেছে, যা নির্ধারণ করার নৈতিক অধিকার কেবল জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সার্বভৌম সরকারেরই থাকা উচিত।

জাপানের সঙ্গে গতকালই অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে ফেব্রুয়ারি দেশটির সঙ্গেপ্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রযুক্তি হস্তান্তর’-বিষয়ক একটি চুক্তি সই হয়। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্কসংক্রান্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী সোমবার চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।

বিষয়ে গত ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের রেসিপ্রোকাল শুল্কহার ২০ শতাংশ আছে। অন্যান্য দেশে একই আছে। আবার অনেক দেশে বেশি আছে। তবে আমরা আশা করছি, হয়তো কিছুটা কমতেও পারে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং কেনা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘আমাদের উড়োজাহাজ কেনার ব্যাপারটা তো আলোচনায় আছে। বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির আগেও তাদের পরিকল্পনা ছিল। বোয়িং কোন বছর সরবরাহ করতে পারবে, কী দাম হবে, কনফিগারেশন কী হবেএসব নিয়ে নেগোসিয়েশন চলছে।

সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তার অধিকাংশই ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বলে উল্লেখ করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে ধরনের নীতিগত চুক্তি বা বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার নজির নেই। আন্তর্জাতিকভাবে এটিকে সাধারণত নর্মস বা গুড প্র্যাকটিস হিসেবে ধরা হয় না। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের তৎপরতা দেখলেই বোঝা যায়, ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়গুলোই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। মিয়ানমার করিডোর ইস্যুতে কিছুদিন আগে যে হইচই হয়েছিল, সেটাও প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

সরকারের এমন পদক্ষেপের ফলে সামনে রাজনৈতিক কূটনৈতিক জটিলতা বাড়বে বলে সতর্ক করে ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ সরকারের অনেকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনামূলক ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। ব্যক্তিগত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তারা দীর্ঘদিন পশ্চিমা নেটওয়ার্ক অর্থায়নের পরিসরে কাজ করেছেন। সমস্যা হলো, বিগত সরকারের সময়ে আইন, স্বচ্ছতা জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে যারা সমালোচনা করতেন, এখন তারাই যদি একই ধরনের গোপনীয়তা বা একতরফা সিদ্ধান্তের পথে হাঁটেনতাহলে ভবিষ্যতে মানুষ সিভিল সোসাইটি বা নীতিনির্ধারক গোষ্ঠীর ওপর আস্থা হারাবে।

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের শাসনে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ হয়েছিল, তেমনি পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সম্প্রতি পরপর পাকিস্তানের দুজন মন্ত্রীর ঢাকা সফর। পর্যবেক্ষকদের মতে, সফরগুলো কেবল দ্বিপক্ষীয় সৌজন্য বিনিময় নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে কৌশলগত বার্তা দেয়ার এক ধরনের প্রচেষ্টাও হতে পারে।

দায়িত্বে আসার পর রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছরের মার্চে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা যেন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে আগামী ঈদ উদযাপন করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে জাতিসংঘের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালানো হবে। যদিও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। উল্টো গত বছর এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় পররাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্লাটফর্মে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান মানবিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ডাকে সাড়া দেয়নি কেউই। উল্টো বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা মিলেছে চাহিদার অর্ধেকেরও কম। অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে আছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার। তারা সাম্প্রতিক বিতর্কিত নির্বাচনকেস্বাভাবিকতায় ফেরার পথহিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। বিভিন্ন পর্যায়ে জান্তার পরিকল্পনায় রাশিয়া চীনের অকুণ্ঠ সমর্থন দেশটিকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে।

দায়িত্ব নেয়ার পর প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক বড় উদ্যোগ নিয়েছে . মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে ড্রোন উৎপাদন সংযোজন কারখানা স্থাপন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য জিটুজি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানের কাছেজেএফ-১৭ থান্ডারযুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। চীনের তৈরি ২০টি যুদ্ধবিমান কেনারও উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, যার জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হবে। ইতালি থেকে যুদ্ধবিমান ইউরোফাইটার টাইফুন কিনতে ইতালীয় কোম্পানি লিওনার্দো এসপিএ ইতালির সঙ্গে আগ্রহপত্র সই হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সাবমেরিন ক্রয়, তুরস্ক থেকে টি১২৯ অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্ল্যাক হক মাল্টিরোল হেলিকপ্টার ক্রয়ের বিষয়টিও আলোচনা এসেছে।

এছাড়া গত নভেম্বরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ঢাকার কাছেই পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছর পরিচালনার জন্য চুক্তি হয়েছে সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ কোম্পানির সঙ্গে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ছেড়ে দেয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়েছে।

নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে রাষ্ট্রের কৌশলগত বা স্ট্র্যাটেজিক বিষয়ে বড় কোনো চুক্তি অথবা সিদ্ধান্ত নেয়া একেবারেই অনুচিত বলে মনে করেন কেজ বিজনেস স্কুল এবং জিওপলিটিক্স স্ট্র্যাটেজি ল্যাবের (ফ্রান্স) প্রধান অধ্যাপক . সাজ্জাদ এম জসীমউদ্দীন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের উচিত ছিল দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করে স্বচ্ছতা, অংশীজনদের আলোচনা এবং নির্বাচিত সরকারের হাতে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ রেখে এগোনো। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। এতে সন্দেহ তৈরি হয় যে, কিছু সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে বলেই তাড়াহুড়ো করে এগোনো হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ ধরনের তৎপরতা সরকারের অগ্রাধিকার উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।উদাহরণ হিসেবে তিনি বোয়িং কেনার আলোচনা টেনে বলেন, ‘এত বড় কৌশলগত একটি সিদ্ধান্ত নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য টু মাচ। এটা ভবিষ্যৎ সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় অথবা চাপের মধ্যে ফেলবে। রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক-কূটনৈতিক জটিলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বন্দরসংশ্লিষ্টদের আপত্তি বাধা উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেয়ার উদ্যোগ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে নেমেছেন বন্দরকর্মীরাফলে চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে সরকার অস্বাভাবিক দ্রুততায় একাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তি সমঝোতা সম্পাদন করেছে। এসব চুক্তিতে কী কী শর্ত রয়েছে, তার বিশদ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, এসব উদ্যোগের সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং অতিগুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা হস্তান্তরের দ্বারপ্রান্তে এসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলো জাতীয় সংসদ জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারের অনুমোদনের জন্য রেখে দেয়া অধিক সমীচীন ছিল। রাষ্ট্রের বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক বুনিয়াদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব চুক্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা-পর্যালোচনা, পর্যাপ্ত হোমওয়ার্ক এবং দরকষাকষির প্রয়োজন রয়েছে।

কীভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য করা যায় মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের মূল আলোচ্য এটাই হওয়া উচিত ছিল জানিয়ে ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে এখন সাত দিনও নেই। এমন সময়ে ধরনের ইস্যুতে চুক্তি করলে তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে না যাওয়াই ভালো ছিল। ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেয়া উচিত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে কেবল নীতির খসড়া বা রোডম্যাপ প্রস্তুত করতে পারত। তাদের ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য অপ্রয়োজনীয় চাপ জটিলতা তৈরি করবে।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেকে দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন নাএমন অভিযোগ রয়েছে। কারো কারো দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অবস্থায় জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলো অংশীজন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা ছাড়া দ্রুত সম্পাদনের চেষ্টা দেখা গেলে জনমনে সংশয় সন্দেহ বাড়া স্বাভাবিক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সরকারের সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার আছে, তবে সাম্প্রতিক যেসব চুক্তি সমঝোতার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, সেখানে স্বচ্ছতার ঘাটতি স্পষ্ট। সরকারের বড় সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত স্বচ্ছতা জবাবদিহি; কিন্তু ক্ষেত্রে সেই জবাবদিহির ঘাটতি থাকায় নানা প্রশ্ন উঠছে এবং মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। প্রক্রিয়াগতভাবে আরো সতর্কতা দরকার ছিল। চুক্তিগুলো যথাযথ মূল্যায়ন, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং অংশীজনদের মতামত বিবেচনা করে করা হচ্ছে কিনাসে বিষয়ে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে।

হুমায়ুন কবীরের মতে, ‘ সরকারের কাছে মানুষের বড় প্রত্যাশা ছিল সংস্কার। তা পূরণ হয়েছে বলে মানুষ মনে করছে না। বরং কিছু উপদেষ্টার বিশেষ তৎপরতা অগ্রাধিকার জনমনে প্রশ্ন কৌতূহল তৈরি করেছে।

 

You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?

আমাদের অনুসরণ করুন

জনপ্রিয় বিভাগ

সাম্প্রতিক মন্তব্য