চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ডলার, দিনার ও রিয়েল পাচারের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তিন বছর ধরে চলা এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে বিমানবন্দরে কর্মরত কয়েকজন সিভিল এভিয়েশন কর্মচারীর জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই ও **ওমান**গামী যাত্রীদের হাত ধরে বিদেশি মুদ্রা পাচার করা হতো—গ্রিন চ্যানেল ব্যবহার করে, চুক্তিভিত্তিক ‘নিরাপদ পারাপার’-এর বিনিময়ে।
বিমানবন্দরের কর্মচারী ওসমান সিকদার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এই চাঞ্চল্যকর মুদ্রা পাচার নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব প্রকাশ পায়। তদন্ত কর্মকর্তা পতেঙ্গা থানার ইন্সপেক্টর ফরিদুল আলম জানান, খুনের সূত্র ধরেই মুদ্রা চোরাচালানের তথ্য–উপাত্ত সামনে আসে। দুবাই ও ওমানে মুদ্রা পাচার নিয়ে বিরোধের জেরেই ওসমান সিকদারকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে চোরাকারবারিদের পাশাপাশি বিমানবন্দরের দুই কর্মচারীর সম্পৃক্ততার তথ্যও মিলেছে।
শ্রমিক ভিসার আড়ালে পাচার
২০১৮ সালে শ্রমিক ভিসায় দুবাই ও ওমানে যাওয়া জাহেদুল মঞ্জুর সনজু, সোহেল ও সুমন করোনাকালে কাজ হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন। পরে বৈধভাবে বিদেশে সীমিত পরিমাণ মুদ্রা নেওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা অবৈধ মুদ্রা ব্যবসায় জড়ান। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা প্রহরী বাদল মজুমদারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে ২০২২ সাল থেকে চট্টগ্রাম হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ডলার, দিনার ও রিয়েল পাচার শুরু হয়। এই চক্রে যুক্ত হন সিভিল এভিয়েশনের কর্মচারী ভিকটিম মো. ওসমান ও ইব্রাহিম খলিল।
৩০ লাখ টাকার বিরোধে খুন
তদন্তে জানা গেছে, খুনের এক মাস আগে চক্রটি গ্রিন চ্যানেল ব্যবহার করে ৩০ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা পারাপারের চুক্তি করে। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত অজুহাতে ওই অর্থ আত্মসাৎ করা হলে চক্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকায় ওসমান সিকদারকে মারধরের একপর্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। পরে লাশ পতেঙ্গা সাগরপাড় এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়।
আরও ১০ জনের নাম, দায়মুক্তির অভিযোগ
আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিতে ইব্রাহিম খলিল আরও ১০ জন সিভিল এভিয়েশন কর্মকর্তা–কর্মচারীর নাম উল্লেখ করেন, যাদের সরাসরি মুদ্রা পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তবে পুলিশি তদন্তে তারা আপাতত দায়মুক্তি পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিমানবন্দর–সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্র বলছে, মুদ্রা, সিগারেট ও স্বর্ণ চোরাচালানে কেউ প্রত্যক্ষ, কেউ পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ পুরোনো।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ বিভাগ জানায়, চোরাচালানসহ যেকোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের অবস্থান কঠোর। হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তদন্তে পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
তদন্ত চলমান থাকায় মুদ্রা পাচারের পুরো নেটওয়ার্ক ও সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের নাম প্রকাশে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?