ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। দলটির সমর্থকদের একাংশ বাধ্য হয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার কথা ভাবলেও আরেক অংশ ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এমন বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ আদৌ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারত যান। এরপর আওয়ামী লীগকে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। শেখ হাসিনার প্রতিষ্ঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাঁর অনুপস্থিতিতে গণহত্যার নির্দেশ দেওয়ার দায়ে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
আলজাজিরা রাজবাড়ীর আওয়ামী লীগ সমর্থক রিপন মৃধার বক্তব্য তুলে ধরে জানায়, তিনি বাবার মুখে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগের সংকটের কথা শুনেছেন। তাঁর ভাষায়, “এ বছর যা হচ্ছে, তা যেন দল পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মতো।”
গোপালগঞ্জের রিকশাচালক সোলায়মান মিয়া বলেন, “নৌকা ছাড়া নির্বাচন নির্বাচনই না।” তাঁর পরিবার এবার ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আলজাজিরার মতে, এই মনোভাব গোপালগঞ্জের অনেক বাসিন্দার মধ্যেই দেখা যাচ্ছে।
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আরমান মনে করেন, আওয়ামী লীগ কৌশলগতভাবে এখন নীরব রয়েছে। তাঁর দাবি, দলটি রাজনীতি থেকে মুছে যাওয়ার মতো নয় এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আবার ফিরবে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দৈনিক জবান পত্রিকার সম্পাদক রেজাউল করিম রনি ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে টিকে থাকাই আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে স্থানীয় বাস্তবতায় মানিয়ে নিতে অনেক সমর্থক অন্য প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, যা দলটির সমর্থনভিত্তিক পুনর্গঠনকে কঠিন করে তুলবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করা যাবে কি না—এই প্রশ্নে আওয়ামী লীগের ভেতরে বিভাজন স্পষ্ট। দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনে অনেক সমর্থক হতাশ হওয়ায় আগের অবস্থানে ফেরা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষকের মতে, জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান আওয়ামী লীগের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থানের কারণে দলটি বহুবার নিষিদ্ধ ও দমন-পীড়নের শিকার হলেও টিকে আছে। বর্তমানে বিভিন্ন জরিপে জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফলের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আলজাজিরাকে বলেন, আওয়ামী লীগের আবেদন কেবল দলীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবেও গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে দলটি পুরোপুরি মুছে যাওয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এক জরিপে এখনও প্রায় ১১ শতাংশ সমর্থন রয়েছে আওয়ামী লীগের।
এ বিষয়ে আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন পূর্ণ গণতান্ত্রিক হয় না। তবে দমন-পীড়নের কারণে দলটি অনেকের চোখে বৈধতা হারিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। দক্ষিণ এশিয়ায় বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক দলগুলো সহজে বিলুপ্ত হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি বদলালে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন অসম্ভব নয়, তবে আপাতত দলটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?