আজ ৪ এপ্রিল, ঐতিহাসিক "তেলিয়াপাড়া দিবস"। ১৯৭১ সালের এই দিনে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণী এক বৈঠকে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতের পর এপ্রিলের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন দ্রুত গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। ২ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় পৌঁছান। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান আশ্রাফ আলীর ব্যবস্থাপনায় তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ম্যানেজার বাংলোয় ৪ এপ্রিল এক গোপন বৈঠক ডাকা হয়।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ২৭ জন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা, যাদের মধ্যে ছিলেন মেজর খালেদ মোশারফ, মেজর কেএম শফিউল্লাহ, মেজর সি আর দত্ত, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী, লেঃ কর্নেল আব্দুর রব প্রমুখ। বৈঠকে ওসমানী সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্রকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে কমান্ডার নিয়োগের পাশাপাশি তিনটি ব্রিগেড গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রধান রণকৌশল হিসেবে গঠিত ১১টি সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন:
১নং সেক্টর: মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীতে মেজর রফিকুল ইসলাম)
২নং সেক্টর: মেজর খালেদ মোশারফ (পরবর্তীতে মেজর হায়দার)
৩নং সেক্টর: মেজর কেএম শফিউল্লাহ (পরবর্তীতে মেজর নুরুজ্জামান)
৪নং সেক্টর: মেজর সি আর দত্ত
৫নং সেক্টর: মেজর মীর শওকত আলী
৬নং সেক্টর: উইং কমান্ডার আবুল বাশার
৭নং সেক্টর: মেজর কাজী নুরুজ্জামান
৮নং সেক্টর: মেজর ওসমান চৌধুরী (পরবর্তীতে মেজর এমএ মনছুর)
৯নং সেক্টর: মেজর আব্দুল জলিল
১০নং সেক্টর: নৌ-কমান্ডোদের নিয়ে গঠিত
১১নং সেক্টর: মেজর আবু তাহের (পরবর্তীতে ফ্লাইট লেঃ হামিদুল্লাহ)
এছাড়া, মুক্তিবাহিনীকে তিনটি ব্রিগেডে ভাগ করা হয়:
জেড ফোর্স (মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে)
এস ফোর্স (মেজর শফিউল্লাহর নেতৃত্বে)
কে ফোর্স (মেজর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে)
তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ঐতিহাসিক বাংলোটি পরে ৩নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে প্রতি বছর ৪ এপ্রিল আলোচনা সভা ও স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া, মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে "ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া সম্মেলন" শিরোনামে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে।
জেলা
প্রশাসন ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়
এই স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে পর্যটন
ও গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা
হাতে নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের এই গৌরবময় অধ্যায়
নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বিশেষ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তেলিয়াপাড়ার সিদ্ধান্ত মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রূপ
দিয়েছিল। এই দিনটি শুধু
একটি স্মরণীয় তারিখ নয়, বরং বাংলাদেশের
স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?