গত এক দশকে আট লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমালেও তাঁদের বড় একটি অংশ চরম শোষণের শিকার হয়েছেন। অন্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় অনেক বেশি নিয়োগ ফি দিতে গিয়ে তাঁরা ভারী ঋণের বোঝায় ডুবে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে যে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের পাঠানো হয়েছে, বাস্তবে সেই কাজ আর মেলেনি। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) প্রকাশিত ব্লুমবার্গের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সরকারি কর্মকর্তা, রিক্রুটিং এজেন্ট, শ্রম বিশ্লেষক ও অভিবাসীসহ শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া গভীরভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি মধ্যস্বত্বভোগী এবং সরকার–সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী একটি চক্র পরস্পরের যোগসাজশে অসহায় শ্রমিকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ অর্থ আদায় করছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে ঋণদাসত্ব, জোরপূর্বক শ্রম ও মানবপাচারের উচ্চ ঝুঁকি।
সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছেন, মালয়েশিয়ার ক্ষমতাসীন এলিটদের উচ্চপর্যায়ের অনেকেই এসব অনিয়মের বিষয়ে অবগত ছিলেন। তবে নিয়োগ ফি থেকে আর্থিক লাভ হওয়ায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের সরকার কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ব্যাপকভাবে অভিবাসী শ্রমিকনির্ভর। দেশটিতে প্রতি পাঁচটি চাকরির একটি করেন বিদেশি শ্রমিকরা, যারা পাম অয়েল, উৎপাদনশিল্প, নির্মাণ খাত ও ডেটা সেন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করছেন। তবে এসব শ্রমিকের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত ও শোষিত। ভিসা জটিলতা ও ঋণের চাপে তাঁরা অনেক সময় চাকরি বদলাতে বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতেও সাহস পান না।
এই নিয়োগ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ডিজিটাল রিক্রুটমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘বেস্টিনেট’-এর নাম। এর প্রতিষ্ঠাতা ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম। নথিপত্র অনুযায়ী, তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো গত দশ বছরে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে। আমিনুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তাঁর ব্যবস্থার ফলে দুর্নীতি কমেছে। তবে সমালোচক ও তদন্তকারীদের মতে, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একচেটিয়া নিয়োগ কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা শ্রমিকদের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি শ্রমিকের নিয়োগ ব্যয় সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৬০০ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এই ব্যয় ইন্দোনেশিয়া বা নেপালের শ্রমিকদের তুলনায় অনেক বেশি। এ ঘটনায় বাংলাদেশে অন্তত এক ডজন রিক্রুটিং এজেন্টকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অর্থপাচার, চাঁদাবাজি ও মানবপাচারের অভিযোগে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রত্যর্পণ চাওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়নি।
ব্লুমবার্গের এই অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল তদারকির কারণে শ্রম অভিবাসন একটি লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন ঋণগ্রস্ত ও অসহায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা। এক শ্রম অধিকারকর্মীর ভাষায়, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমপথ বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে শোষণমূলক অভিবাসন রুটগুলোর একটি।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?