বিদেশে পড়াশোনা, কাজ বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও অনেক আবেদনই কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বাতিল হচ্ছে এমন অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
ঝিনাইদহের বাসিন্দা মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদন করে ভর্তির সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি। তিনি বলেন, সব নথি যাচাই করেই আবেদন করেছিলেন, কিন্তু ভিসা বাতিলের কারণ জানানো হয়নি। একই অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ ভিসা প্রত্যাশী ঢাকার মোহাম্মদপুরের মোহাইমিনুল খান ও তাঁর পরিবারের। তাঁদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা নীতিতে কঠোরতা বেড়েছে, নতুন ভিসা বন্ড তালিকায় বাংলাদেশের নাম যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
কেন ভিসা জটিলতা বাড়ছে
ভিসা প্রসেসিং–সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি বড় কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতার সনদ, প্রশিক্ষণ সার্টিফিকেট ও ব্যাংক স্টেটমেন্টে জালিয়াতির প্রবণতা বাড়ছে। এতে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের আবেদনকারীদের ওপর সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যাওয়া বা এক দেশে গিয়ে অন্য দেশে অনুপ্রবেশের ঘটনাও বড় কারণ। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নয়, ভবিষ্যতে সৎ আবেদনকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সুশাসনের ঘাটতিও ভিসা সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কও বিবেচনায় নেয়া হয়।সম্প্রতি ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশ বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়ার হার কমিয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে শ্রমবাজার কার্যত বন্ধ। অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুরে সীমিতসংখ্যক মানুষ যেতে পারলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। প্রতিবেশী ভারতও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা বাড়িয়েছে।এ অবস্থায় মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসায় অবস্থান বা অবৈধ থাকার কারণে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর ঘটনাও বাড়ছে। ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের তথ্যমতে, প্রতিবছর গড়ে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশিকে বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে মূলত সৌদি আরবেই কিছু বাংলাদেশি শ্রমিক যেতে পারছেন। জাপান ও সিঙ্গাপুরে অল্পসংখ্যক দক্ষ জনশক্তি গেলেও অন্য দেশগুলো প্রায় বন্ধ।
পর্যটন খাতে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও চীনে কিছু সুযোগ থাকলেও থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের ভিসা ভবিষ্যতে আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের মতে, ভিসা সংকটের পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা বড় কারণ। তিনি বলেন, “এটা পুরো সিস্টেমের দায়। সুযোগ থাকলেও আমরা নিজেদের দোষে তা কাজে লাগাতে পারছি না।”
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদও মনে করেন, ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—দুই পক্ষের দায়ই রয়েছে। ভুল তথ্য, জাল নথি এবং বিদেশে গিয়ে নিয়ম ভাঙার কারণে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, বিদেশ যেতে আগ্রহীদের প্রায় ৮০ শতাংশই দালালনির্ভর। এতে জাল কাগজপত্রের ঝুঁকি বাড়ে এবং বাংলাদেশ ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় পড়ে। ফলে ইউরোপসহ অনেক দেশ এখন বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ও বায়োমেট্রিক যাচাই আরও কঠোর করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো কঠিন। যতদিন এসব কাঠামোগত সমস্যা সমাধান না হবে, ততদিন বিদেশে যেতে বাংলাদেশিদের ভিসা সংকট কাটবে না।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?