clock ,

গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকারবিরোধী তৎপরতা রোধ করতে হবে

গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকারবিরোধী তৎপরতা রোধ করতে হবে

গত বছর জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীরা দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে জাতীয় ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়ের কারিগর হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাদের নিষ্ঠা, লক্ষ্যের প্রতি অঙ্গীকার এবং শত নিপীড়ন, হত্যা, নির্যাতনের মুখে অবিচল থাকার সাহসের কারণেই শুরুতে যা শুধু শিক্ষার্থী-তরুণদের কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে পরিচিত ছিল, তা পরিণত হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানে। তাতে শামিল হয়েছেন এ দেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, রিকশাচালক, কারখানার শ্রমিক, দিনমজুর, দোকান কর্মচারী, পথচারী, খুদে ব্যবসায়ী, আদিবাসী তরুণ-প্রবীণ, হকার, কৃষক, মজুর, শিল্পী, চাকরিজীবী, রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মী, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী, গৃহবধূ এক কথায় সব স্তর ও শ্রেণির নাগরিক। জুলাই সংগ্রামীদের একটি ক্ষুদ্র অংশের বিরুদ্ধে আদর্শচ্যুতির অভিযোগ উঠলেও জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জুলাই চেতনা ধারণ এবং তার বাস্তবায়নে এখনও অঙ্গীকারবদ্ধ বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। 



জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দাবির কেন্দ্রে ছিল সব ধরনের বৈষম্যের অবসান। অর্থাৎ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে যত ধরনের বৈষম্য-বঞ্চনা যুগের পর যুগ নারী-পুরুষ-ভিন্ন লিঙ্গ নির্বিশেষে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনকে পিষ্ট করে চলেছে, তার অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার। এসব দাবি তারা মিছিল, সভা, পোস্টার-প্ল্যাকার্ডেই শুধু তুলে ধরেননি; ছোট-বড় সব শহর, বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ-স্কুলে আঁকা শত শত দেয়ালচিত্র ও দেয়াললিপিতেও স্পষ্ট ভাষায় বৈষম্যের মূলোৎপাটনের কথা উঠে এসেছে। কিন্তু আক্ষেপ ও দুঃখের বিষয়, আজ আমরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যেখানে গণঅভ্যুত্থানকারীদের সাড়া জাগানো স্বপ্নের কথা দেয়ালে থাকলেও সরকারি নীতি-আইনে মুছে ফেলার জন্য স্বার্থান্বেষী মহল উঠেপড়ে লেগেছে। 

বাংলাদেশ হচ্ছে বহু জাতি, সম্প্রদায়, ধর্ম, গোষ্ঠী, ভাষা, সংস্কৃতির অপূর্ব বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। দেশটি বহু জাতি ও সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্রও বটে। কিন্তু ওই স্বার্থান্বেষী উগ্রবাদী, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তা স্বীকার তো করেই না, উপরন্তু যারা এই বহুত্ববাদী ধারণাকে লালন করে তাদের ওপর আক্রমণ, নির্মম হামলা চালাতেও দ্বিধা করছে না, যা অতীতের কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট শক্তির আচরণেরই পুনরাবৃত্তি। এ ধরনের হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থতার দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরেই কোনো না কোনোভাবে বর্তায়। বিশেষ করে সময়োপযোগী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা, অতিরিক্ত নমনীয়তা; কখনও কখনও নতজানু অবস্থানের সুযোগে এসব অপশক্তি বারবার হামলা চালিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সমাজের দুর্বল অবস্থানে থাকা নাগরিকরা আজ চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখে।   


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি ও প্রচার শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে উগ্রবাদের সমর্থনে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো একই ধারায় তাদের প্রচার চালাচ্ছে, যাতে অতীতের বৈষম্যভিত্তিক রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা সবই বহাল থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা যেন আরও পশ্চাৎমুখী হতে পারে, তারও চেষ্টা চালানো হবে
এতে কোনো সন্দেহ নেই। 

গণঅভ্যুত্থানে শত শত নিরস্ত্র শিক্ষার্থীসহ নারী-পুরুষ-শ্রমজীবী মানুষ নির্বিশেষে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন শাসকদের বুলেট ও অন্যান্য অস্ত্রের আঘাতে। ২৫ সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের একটি অংশ চিরকালের জন্য পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্বের শিকার। সেই রক্তক্ষয়ী মহান সংগ্রামের উত্তরাধিকারী আমরা সবাই। আমরা কি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গৌরবময় অর্জনের অগ্রযাত্রাকে পশ্চাৎমুখী করে দেওয়ার অপচেষ্টাকে মেনে নিতে পারি? কখনোই নয়।  


আমরা তরুণ শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, শিক্ষক, শুভাকাঙ্ক্ষী, নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার, ভূমি-পরিবেশ-কৃষি অধিকারকর্মী ও পেশাজীবী হাজারো মানুষ জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই আন্দোলনকারীদের ন্যায্য দাবির সমর্থনে পাশে ছিলাম। তাদের পক্ষ থেকে আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীসহ তরুণ বন্ধু ও সংবেদনশীল নাগরিকদের এ আহ্বান জানাতে চাই আপনারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অঙ্গীকার ভুলে যাবেন না; কাউকে ভুলতে দেবেন না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের রাষ্ট্র ও সমাজ সংস্কারের যে দৃঢ়পণ শপথ আর দেশ গড়ার সুমহান স্বপ্ন, তাকেও ভূলুণ্ঠিত হতে দেবেন না। কোনোমতেই না। তার অর্থ হচ্ছে, আপনারা যে যেখানে আছেন; ক্যাম্পাস কিংবা ক্যাম্পাসের বাইরে; পেশায়, পেশার বাইরে, কারখানা অথবা ফসলের ক্ষেতে, চাকরিতে, চাকরির  অপেক্ষায় সবাইকে সমস্বরে আওয়াজ তুলতে হবে। সমাজের সকল স্তর, শ্রেণি, পেশা, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব ধরনের বৈষম্যবিরোধী অবস্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সুরক্ষায় নিম্নোক্ত দাবিগুলো আমরা বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ ও বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকব। 


ক. একাত্তর ও চব্বিশের অবিচ্ছেদ্য অভীষ্ট বহু জাতি-গোষ্ঠী, বহুধর্মী, বহুভাষী ও বহু সংস্কৃতির বাংলাদেশে সাম‍্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতির মূল্যবোধ ও চর্চার পরিপন্থি সকল শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে। 

খ. ঘৃণার রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও সহিংসতাকে প্রতিরোধ করতে হবে। 

গ. দেশ কিংবা বিদেশ থেকে যেসব উদ্দেশ্যমূলক গুজব, অপপ্রচার অথবা উস্কানিমূলক বক্তব্য আসুক, তার তথ্যভিত্তিক প্রতিবাদ জানাতে হবে। 

ঘ. তরুণ, নারী, শ্রমজীবী, পেশাজীবী ও প্রান্তিক কৃষক, আদিবাসী ও অন্যান্য বিপন্ন মানুষের সঙ্গে সংহতি জোরদার করতে হবে। 

ঙ. সুশাসন এবং আইনের শাসনের পক্ষে সোচ্চার অবস্থান নিতে হবে। ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমবেতভাবে দাঁড়াতে হবে।   

চ. রাষ্ট্র ও সমাজ সংস্কারের দাবির প্রশ্নে কোনো আপস নয়। পুলিশের নিয়ন্ত্রণভার স্বাধীন জাতীয় পুলিশ কমিশনের ওপর ন্যস্ত করতে হবে। স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, কৃষি, পরিবেশের কোনো কমিশন হয়নি। এ জন্য নির্বাচিত সরকারকে সংস্কার কমিশন অবিলম্বে গঠন করতে হবে। 

ছ. নারীর অধিকার সুরক্ষা, নারী স্বাধীনতা, ভূমি অধিকারসহ তাদের সকল ন্যায্য অধিকারের প্রতি পূর্ণ একাত্মতা ও সক্রিয় অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। নারী সংস্কার কমিশনের সকল ন্যায্য সুপারিশ নির্বাচিত সরকারকে বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। 

জ. জনপ্রশাসনের সকল স্তরে সংস্কার কার্যকর করতে হবে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসনের মধ্যে বিদ্যমান অসততা, অদক্ষতা দূর করে দক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। 

ঝ. কর্মসংস্থানকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। তরুণদের ব্যাপক ও ন্যায্য কর্মসংস্থানের দাবিকে জাতীয় দাবিতে পরিণত করতে হবে। তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান, দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার দ্রুত প্রসার ঘটাতে হবে। 

ঞ. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষা এবং নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, দ্বিমত প্রকাশের অধিকারকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানাতে হবে। 
ট. বিপন্ন পরিবেশ সুরক্ষা এবং পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ নদী, জলাধার, বন, পাহাড় ইত্যাদি বাঁচাতে গোটা দেশকে ঐক্যবদ্ধ, সচেতন করে পরিবেশবিনাশী সকল কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে তরুণ সমাজসহ সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। 

ঠ. নারী, শিশু ও কিশোরীদের প্রতি সহিংসতা, ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে তাদের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন, ধর্ষণ যে কোনো মূল্যে প্রতিরোধ করতে হবে। যারা নারীবিদ্বেষ প্রচার করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত, জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। 

ড. ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অন্যান্য প্রান্তিক অবস্থানে থাকা নাগরিক যেমন প্রতিবন্ধী, হিজড়া, বেদে, দলিত, হরিজনসহ সবার ন্যায্য অধিকারের স্বীকৃতি ও বাস্তবায়নের দাবিকে জোরালো সমর্থন দিতে হবে।



প্রস্তাবনা

১. আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও সম্পাদক, সর্বজনকথা ২. ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: অর্থনীতিবিদ ৩. ড. ইফতেখারুজ্জামান: লেখক ও গবেষক ৪. শিরীন হক: নারী অধিকারকর্মী ৫. সারা হোসেন: আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ৬. সামিনা লুৎফা: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৭. জাকির হোসেন: নির্বাহী পরিচালক, নাগরিক উদ্যোগ ৮. অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান: প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন ৯. অ্যাডভোকেট তাসলিমা ইসলাম: নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), ১০. পল্লব চাকমা: নির্বাহী পরিচালক, কাপেং ফাউন্ডেশন ১১. পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক ১২. শামসুল হুদা: ভূমি অধিকার ও মানবাধিকারকর্মী 

 

You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?

আমাদের অনুসরণ করুন

জনপ্রিয় বিভাগ

সাম্প্রতিক মন্তব্য