বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতা বা ওয়ার্কপ্লেস ওয়েলবিয়িং এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমানে এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার মধ্যে কর্মজীবী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৫ শতাংশ। এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে প্রতিবছর আনুমানিক ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হচ্ছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে (GCC) ম্যাককিনসির এক বৃহৎ জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ কর্মী মানসিক সুস্থতার অবনতি বা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার উপসর্গের কথা জানিয়েছেন, আর এক-তৃতীয়াংশ কর্মী সরাসরি বার্নআউট-এর লক্ষণ অনুভব করছেন।
বার্নআউট বলতে বোঝায় দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত চাপের ফলে সৃষ্ট মানসিক, শারীরিক ও আবেগগত ক্লান্তি। যদিও অভিজ্ঞতাটি ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন, সাধারণত এটি চরম অবসাদ, কাজের প্রতি বিচ্ছিন্নতা এবং কর্মদক্ষতা হ্রাসের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের চাপ, কাজ ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্যহীনতা, অস্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন এবং ব্যবস্থাপকের পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব বার্নআউটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
তবে বার্নআউট শনাক্ত করা সহজ নয় এমনকি নিজের ক্ষেত্রেও। অনেক কর্মী প্রত্যাশার চাপে অনুভূতি আড়াল করেন বা কথা বলতে সাহস পান না। এর পেছনে রয়েছে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্টিগমা। পেশাগত ক্ষতি, নেতিবাচক মূল্যায়ন কিংবা বিচার হওয়ার ভয় কর্মীদের সহায়তা নেওয়া থেকে বিরত রাখে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্য, কর্মস্থলে অন্তর্ভুক্তি এবং কর্মী ধরে রাখার ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যেও এই স্টিগমা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষণায় দেখা যায়, এখানে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত জটিলতা, কর্মক্ষেত্রের সামাজিক রীতি, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং উন্নয়নের সীমিত সুযোগ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। বিভিন্ন ধর্ম ও সামাজিক গোষ্ঠীতে মানসিক চাপ ও উদ্বেগকে ভিন্নভাবে দেখা হয়। পাশাপাশি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও কঠোর শ্রেণিবিন্যাসভিত্তিক কাঠামোও চাপ বাড়ায়।
মার্শ মার্সার বেনিফিটস এর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, জিসিসি অঞ্চলে চিকিৎসা ব্যয় বেড়েই চলেছে, অথচ কর্মীদের মধ্যে এই ধারণা কমছে যে নিয়োগকর্তারা তাদের সুস্থতা নিয়ে সত্যিই ভাবেন। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে কাজের সঙ্গে শারীরিক ও হৃদ্রোগজনিত ঝুঁকিও জড়িত।
তবুও ইতিবাচক দিক হলো যেসব কর্মী তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধা পান, তাদের বেশিরভাগই কাজে নিজেকে সফল ও পরিপূর্ণ মনে করেন। কাজ শুধু আয়ের উৎস নয়; এটি সামাজিক সংযোগ, কাঠামো, উদ্দেশ্য ও অর্থবোধও দেয়। ভালো মানসিক সুস্থতা অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাবে, কর্মীদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতায় বিনিয়োগ করলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ৩.৭ থেকে ১১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মূল্য সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই লাভ নিশ্চিত করতে হলে ভারসাম্য জরুরি যাতে বার্নআউট কমে, কর্মী ছাড়ার প্রবণতা হ্রাস পায় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও সহনশীল কর্মক্ষেত্র হলো এমন জায়গা, যেখানে মানুষ অসুস্থ বা আহত না হয়ে কাজ করতে পারে এবং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা উন্নত করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এ ক্ষেত্রে তিনটি স্তরে কাজের পরামর্শ দেয়—প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও উন্নয়ন, এবং স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত কর্মীদের সহায়তা। কাজের চাপ, কর্মঘণ্টা ও কর্মস্থলের সম্পর্ক মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিরোধের অংশ; আর মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা নিশ্চিত করা সুরক্ষা ও উন্নয়নের অন্তর্ভুক্ত।
স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা কর্মীদের জন্য যুক্তিসংগত সমন্বয় ও কাজে ফেরার কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য প্রয়োজন নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি, পর্যাপ্ত সম্পদ ও বিনিয়োগ এবং কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
পরিবর্তন আনতে হলে নেতৃত্বের ভূমিকা ও জবাবদিহি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শীর্ষ পর্যায়ে কল্যাণ কর্মসূচির দায়বদ্ধতা যেমন কেপিআই নির্ধারণ বা বোর্ড পর্যায়ে নিয়মিত পর্যালোচনা—বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে কর্মীদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ মধ্যম স্তরের ব্যবস্থাপকদের সমর্থন ছাড়া অনেক ভালো উদ্যোগও বাস্তবে ব্যর্থ হয়, যা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রত্যাশিত সুফল হারানোর কারণ হয়।
জবাবদিহির অংশ হিসেবে সচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন। সহায়তা সেবার (যেমন ইএপি বা মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা) কম ব্যবহার প্রায়ই ঘটে তথ্যের অভাব, প্রবেশপদ্ধতি না জানা বা স্টিগমার কারণে। পরিবর্তনের অগ্রগতি পরিমাপ করলে কোন উদ্যোগ কাজ করছে আর কোনটি করছে না তা বোঝা সহজ হয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপটে গবেষণা বলছে, নমনীয়তা, নেতৃত্বের আচরণ ও স্পষ্ট দায়িত্ব কাঠামো কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও কল্যাণে বড় ভূমিকা রাখে।
এ কারণে নেতাদের নিজে উদাহরণ তৈরি করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যেমন নমনীয় কাজের নীতি মেনে চলা, ছুটি নেওয়া, মধ্যাহ্নভোজে হাঁটাহাঁটি করা, সপ্তাহান্তে ই-মেইল না পাঠানো কিংবা ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে খোলামেলা কথা বলা। এসব আচরণ কর্মীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, কল্যাণ নিয়ে কথা বলা স্বাভাবিক, এবং একটি জবাবদিহিমূলক ও সহায়ক কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক : হেরিয়ট-ওয়াট ইউনিভার্সিটি দুবাইয়ের স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর সহকারী অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র সামাজিক ও সাংগঠনিক গতিশীলতা।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?