ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়টি আবারও রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। জাতীয় সংসদের প্রার্থী হিসেবে বৈধ-অবৈধ বিতর্কে ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এই বিতর্ক নিছক আইনি জটিলতায় সীমাবদ্ধ নেই। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলোও সামনে এনেছে। মূল প্রশ্নটি যদিও খুব সরল; যিনি আইন প্রণয়ন করবেন; রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অংশ নেবেন, তিনি কি এককভাবে বাংলাদেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন নাকি অন্য কোনো রাষ্ট্রের আনুগত্য পোষণ করবেন?
আইনের দৃষ্টিতে কোনো প্রার্থী যোগ্য কিনা, সেটি নির্বাচন কমিশন ও আদালতের এখতিয়ার। এ কথাও সত্যি, রাজনীতি শুধু নিয়মকানুনে চলে না। এখানে বিশ্বাসের গুরুত্ব অনেক। কারণ জনগণ যাঁকে সংসদে পাঠাবে তাঁর কাছে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা বা প্রশাসনিক দক্ষতা নয়; নিশ্চয়তাও খোঁজে। জনগণ নিশ্চিত হতে চায়– সংকটে পড়লে নির্বাচিত প্রতিনিধি তাদের সঙ্গে থাকবেন। বিপদের সময় নেতা জনগণকে একা রেখে পালিয়ে যাবেন না– সেই নিশ্চয়তা জনগণ পেতে চায়। এখানেই দ্বৈত নাগরিকত্ব সমস্যার জন্ম দেয়।
তা ছাড়া দ্বৈত নাগরিকত্ব মানে শুধু দুটি পাসপোর্ট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অন্য একটি রাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ, আইনি দায়বদ্ধতা এবং প্রয়োজনে সেই রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার বাধ্যবাধকতা। ফলে প্রশ্ন ওঠে, যিনি আইন প্রণয়ন করবেন; রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অংশ নেবেন; এমনকি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত বিষয়ে অবস্থান নেবেন, তিনি দ্বৈত নাগরিক হলে এককভাবে বাংলাদেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা সম্ভব হবে কিনা?
প্রশ্নটি এখন আরও তীব্র হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম দেখে। উপদেষ্টা পরিষদ এবং বিভিন্ন সংস্কার কমিশনে দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি দেশে দ্বৈত মানদণ্ড তৈরি করেছে, যা ইচ্ছা করলে সহজেই এড়ানো যেত। আমরা কী দেখছি? একদিকে সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্বকে অযোগ্যতার প্রশ্নে তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্র সংস্কারের মতো গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবসম্পন্ন প্রক্রিয়ায় দ্বৈত নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রাখা হয়েছে।
এর পক্ষের যুক্তি হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যক্তিরা নির্বাচিত নন; তারা কেবল উপদেষ্টা বা বিশেষজ্ঞ। বাস্তবতা হলো, উপদেষ্টা পরিষদ ও সংস্কার কমিশন কেবল পরামর্শ দিচ্ছে না; তারা দেশের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করছে। সংবিধান সংশোধন, প্রশাসনিক কাঠামো, নির্বাচন ব্যবস্থা, ক্ষমতার ভারসাম্য ইত্যাদি বিষয়ে গণভোট এলে তাদের সুপারিশকেই পরবর্তী নির্বাচিত সরকারগুলোর জন্য পালনীয়। সে ক্ষেত্রে তাদের বেলায়ও কি দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নটি এড়ানো যায়? যারা রাষ্ট্রের নিয়ম লিখছেন, তাদের আনুগত্যের প্রশ্ন কি গৌণ?
এই বিতর্ক কোনো প্রবাসীবিদ্বেষ নয়, বরং প্রবাসীদের মধ্যেই স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ নানা দেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক নাগরিকত্ব বদলায়নি। তাদের পরিবার, ভবিষ্যৎ ও শিকড় বাংলাদেশেই। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় এসব মানুষের পাঠানো রেমিট্যান্সই দেশকে বড় ধরনের পতন থেকে রক্ষা করেছে। তারা বিদেশে শ্রম দিলেও আনুগত্য বদলায় না। তাদের কোনো দ্বিতীয় ঠিকানা নেই।
অন্যদিকে একটি
শ্রেণি বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেও দেশে ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব ধরে রাখে। তাদের
পরিবার, সন্তান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশে সুরক্ষিত। ফলে ইচ্ছা
কিংবা অনিচ্ছায় ভুল হলে বা জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হলে দেশ ছেড়ে যাওয়ার বাস্তব
সুযোগ খোলা থাকে। এই প্রবণতা বা সম্ভাবনা শাসন ব্যবস্থার ভেতরে স্থায়ী দুর্বলতা
তৈরি করে।
এখানে স্পষ্টভাবে বলা দরকার, রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো করপোরেট প্রজেক্ট নয়, যেখানে
বাইরে থেকে ‘গ্লোবাল ট্যালেন্ট’ এনে বসালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। রাষ্ট্র
চলে জবাবদিহি, রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার সক্ষমতার ওপর। সে কারণেই
একজন সংসদ সদস্য বা নীতিনির্ধারকের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা শুধু দক্ষতায় সীমিত থাকে না।
বিশ্বের বহু দেশ বাস্তব উপলব্ধি থেকে নাগরিকত্ব নীতিতে কড়াকড়ি করেছে। জাপান ও সিঙ্গাপুর দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না। ভারত বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতীয় নাগরিকত্ব বাতিল করে। ইউরোপের অনেক দেশে দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকলে নাগরিকত্ব পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। কারণ দ্বিতীয় দেশের নাগরিকত্ব কোনো সুবিধার কাগজ নয় বরং এটি দ্বিতীয় দেশের প্রতি বাংলাদেশির দায়িত্ব, শপথ এবং আনুগত্যের সম্পর্ক, যা বাংলাদেশকে বিপদগ্রস্ত করতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন স্পষ্ট নীতিগত ও আইনি অবস্থান জরুরি হয়ে পড়েছে। যা এখন আইনে আছে তার পরিধি বাড়িয়ে সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগসহ নীতিনির্ধারণ ও রাষ্ট্রের ভেতরের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সকল ক্ষেত্রে একক নাগরিকত্ব ও পূর্ণ দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা দরকার। অন্তর্বর্তী সরকার দ্বৈত নাগরিকদের সরকার ও সংস্কার কমিশনে রেখে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা সঠিক হয়নি। এতে জনগণের কাছে বিভ্রান্তিকর বার্তা গেছে– নির্বাচনের বেলায় দ্বৈত নাগরিকত্ব সমস্যা, কিন্তু ক্ষমতার বেলায় নয়।
এই বিভ্রান্তি দীর্ঘ মেয়াদে রাজনীতির ওপর মানুষের আস্থা আরও দুর্বল করবে। কারণ মানুষ এখন আর শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বা সংস্কারের ভাষণ শুনতে চায় না। তারা জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার জায়গাগুলো সুস্পষ্ট দেখতে চায়। এ কারণেই সংসদে এমন মানুষদের যাওয়া দরকার যাদের ভবিষ্যৎ এই দেশেই বাঁধা। কারণ বাংলাদেশ যাদের একমাত্র ঠিকানা, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তারাই।
লেখক: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?
মোহাম্মদ গোলাম নবী