‘আমার বাচ্চা এখনো ভয় কাটাতে পারেনি। ঘুমের মধ্যেও চিৎকার করে বলে ওঠে “মুখ সেলাই করে দিও না।” আবার বলে, “আমি স্কুলে আর যাব না।”’ কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর নয়াপল্টনের একটি স্কুলে নির্যাতনের শিকার চার বছরের কম বয়সী শিশুটির মা।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে পল্টন থানায় সন্তানের নির্যাতনের ঘটনায় মামলা করে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। জানান, সন্তান এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত যে বাবা–মায়ের সঙ্গেও থাকতে চাইছে না। স্কুলে আবার পাঠানো হবে এই ভয়ে সে এখন নানাবাড়িতে রয়েছে।
শিশুটির বাবা জানান, প্রি-প্লে শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁদের একমাত্র সন্তান এমন ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়। নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজ দেখে তাঁরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
শিশুটি বারবার বলছিল, ‘আঙ্কেল বলেছে, বাসায় বললে গলায় পাড়া দেবে। মুখ সেলাই করে দেবে।’
ঘটনাটি ঘটে ১৮ জানুয়ারি নয়াপল্টনের মসজিদ রোডে অবস্থিত শারমিন একাডেমি নামের একটি স্কুলে। স্কুলের অফিস কক্ষে শিশুটিকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুলের পোশাক পরা শিশুটিকে এক নারী প্রথমে চড় দেন। এরপর সেখানে থাকা এক পুরুষ শিশুটির গলা ও মুখ চেপে ধরেন। শিশুটি কান্নাকাটি ও ছটফট করতে থাকে। ওই নারী শিশুটিকে ধরে রাখেন।
পুলিশ জানায়, ভিডিওতে থাকা নারী হলেন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান এবং পুরুষটি স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার। তাঁরা স্বামী–স্ত্রী।
বৃহস্পতিবার দুপুরে শিশুটির মা বাদী হয়ে পল্টন থানায় শিশু আইন ২০১৩-এর ৭০ ধারায় মামলা করেন। মামলায় শারমিন জাহান ও পবিত্র কুমারকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, তাঁরা বর্তমানে পলাতক।
ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (মতিঝিল জোন) হুসাইন মুহাম্মদ ফারাবী বলেন, ভিডিও ফুটেজে নির্যাতনের বিষয়টি স্পষ্ট। ঘটনার পরদিনই পুলিশ স্কুল পরিদর্শন করে।
শিশুটির মা জানান, ঘটনার দিন স্কুল থেকে ছেলেকে আনতে গিয়ে তাঁর পোশাক এলোমেলো ও মনমরা দেখে সন্দেহ হয়। শিক্ষকের কাছে জানতে চাইলে বলা হয়, শিশুটি ‘দুষ্টুমি’ করায় হালকা চড় দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি বিশ্বাস করে তাঁরা বাড়ি ফিরে যান। কিন্তু বাড়ি ফিরে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। গলা, মুখ ও কানে ব্যথার কথা জানায়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে স্কুলে গেলে প্রথমে অভিযুক্তরা ঘটনা অস্বীকার করেন। পরে প্রধান শিক্ষক ক্ষমা চাইলেও ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার মামলা করলে উল্টো হয়রানির হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন শিশুটির বাবা–মা।
বৃহস্পতিবার সকালে স্কুলটি বন্ধ দেখা যায়। তবে একাধিক অভিভাবক সেখানে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেকেই বলেন, ভিডিও দেখে তাঁরা আতঙ্কিত ও মর্মাহত। সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস (বিইউএইচএস)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৬ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার। গবেষকেরা বলছেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধ না হলে তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।
সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ শিশুটির মানসিক সুস্থতায় কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন শিশু সুরক্ষা কর্মী শাহনাজ মনি।
শিশুটির মা বলেন, ‘আমি শুধু আমার সন্তানের জন্য নয় সব শিশুর জন্য বিচার চাই। কোনো স্কুলে যেন আর এমন ঘটনা না ঘটে।’
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?