বৃহস্পতিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সব

Singapore
Corona Update

Confirmed Recovered Death
57,639 57,291 27

Bangladesh
Corona Update

Confirmed Recovered Death
353,844 262,953 5,044

ওরা আছে আরামে-আয়েশে

অনলাইন ডেস্ক | ২৬ জুলাই ২০২০ | ৪:৪৯ অপরাহ্ণ
ওরা আছে আরামে-আয়েশে

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের ‘পাতালে হাসপাতালে’ গল্পের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে আমাদের সমাজের অনেক বাস্তবচিত্রেরই ব্যাপক মিল রয়েছে। ষাট থেকে আশির দশকের সমাজের ক্ষয়, মানুষের ক্ষয়, যন্ত্রণা, নিষ্পেষণ তার ওই গল্পে উঠে এসেছে। এ রকম অবস্থা এখনও বিদ্যমান। জীবনের গায়ে একদিকে নিপীড়নের দগদগে ক্ষত, অন্যদিকে বলবানদের স্বেচ্ছাচারিতা তার ওই গল্পে দাগ কেটেছে অক্ষরে অক্ষরে। ‘পাতালে হাসপাতালে’ গল্পে আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগের যে চিত্র পরিস্টম্ফুটিত হয়েছে, তা যেন আজও এ সমাজের কদর্যতার সাক্ষ্যবহ।

এই গৌরচন্দ্রিকার খোরাক জুগিয়েছে ২২ জুলাই ২০২০ তারিখে একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদ শিরোনাম। ‘নানা ছুতোয় আসামিরা হাসপাতালে’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই সচিত্র সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ক্যাসিনোকাণ্ড’ ও অন্যান্য স্পর্শকাতর মামলায় গ্রেপ্তারকৃত রাঘববোয়ালরা কারাগারের পরিবর্তে বিভিন্ন হাসপাতালের শীতাতপ কক্ষে দিনযাপন করছেন রাজকীয় হালে। প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে আরাম-আয়াসে মাসের পর মাস আইনবিধি লঙ্ঘন করে চিকিৎসার ছল-ছুতোয় দিন কাটাচ্ছেন এই বলবানরা আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে!

‘ক্যাসিনোকাণ্ড’সহ বহু দুস্কর্মের হোতা জি কে শামীম, ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ, হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎকারী ডেসটিনি গ্রুপের কর্ণধার রফিকুল আমিন, স্কুলশিক্ষিকা ও স্থপতি জয়ন্তী রেজা হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আজম রেজা, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি এনএসআইর সাবেক ডিজি ওহিদুল হকসহ (শ্রেণিপ্রাপ্ত হাজতি) অনেক দণ্ডপ্রাপ্ত কিংবা বিচারাধীন আসামি দেশের বিভিন্ন কারাগারে আইনের মোলায়েম প্রয়োগের কারণে ইচ্ছাধীন জীবনযাপন করছেন! ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীম প্রায় চার মাস ধরে হাসপাতালে। অস্ত্র ও মাদক মামলার এই আসামিকে ‘হাতের ক্ষতস্থান থেকে প্লেট সরানো’র জন্য কারাগার থেকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। কথা ছিল চিকিৎসা শেষে দু’দিনের মধ্যে তাকে কারাগারে পাঠানোর। কিন্তু যতদূর জানা যায়- হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ছয় দফা চিঠি দিলেও তাকে কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়নি। দুর্মুখরা বলেছিলেন, তাকে হাসপাতালে পাঠানোর জন্য উচ্চ পর্যায়ের তদবির ছিল। এখন তার আরও স্বঘোষিত ‘রোগ’ দেখা দিয়েছে। এটা স্পষ্ট- শামীম হাসপাতালে থাকার জন্য সংশ্নিষ্ট অসাধুদের ‘ম্যানেজ’ করে নিয়েছেন!

ক্যাসিনোকাণ্ডের আরেক হোতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট টানা আট মাস যাবত বিএসএমএমইউতে খুব আরাম-আয়াসে আছেন ‘বুকে ব্যথা’ নিয়ে। তাকে ফেরত পাঠাতে কারা কর্তৃপক্ষ ১১ দফা চিঠি দিয়েছে; কিন্তু সম্রাটকে পাঠানো হয়নি। গ্রেপ্তারকৃত শামীম-সম্রাট-এনামুল-রূপু-পাপিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর এবং তাদের প্রত্যেকের সম্পদের খোঁজ করতে গিয়ে টাকার খনির সন্ধান পেয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ রকম দৃষ্টান্ত আরও দেওয়া যাবে এবং তারা প্রায় প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন মহলের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের হোমরা-চোমরা। তারা যেমন একেকজন গডফাদার, আবার তাদেরও অনেক গডফাদারের নাম আমরা শুনেছিলাম। তাদের দু-একজনের বিরুদ্ধে দল থেকে বহিস্কারের মতো নগণ্য কিছু ব্যবস্থাচিত্র দৃষ্টিগ্রাহ্য হলেও ব্যাপক অর্থে গডফাদারের গডফাদারদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। ডেসটিনির কর্ণধার রফিকুল আমিন, স্কুল শিক্ষিকা ও স্থপতি জয়ন্তী রেজার স্বামী দণ্ডিত ঘাতক আজম রেজাসহ অনেক বলবানই যাদের কারাগারে থাকার কথা, তারা চিকিৎসার নামে আরাম-আয়াসে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ‘ম্যানেজ’ করে দিন কাটাচ্ছেন।

আমাদের দেশে ক্ষমতা-সংশ্নিষ্ট অপরাধী কিংবা দুস্কর্মকারীরা প্রায় সব সরকারের আমলেই কম-বেশি সমাদর পেয়ে থাকে দলীয় উঁচু স্তরের সুবিধাভোগী কারও কারও কারণে। এই চিত্র আমাদের রাজনীতির কদর্যতার একটি বড় উল্লেখযোগ্য দিক। সম্প্রতি খুলনার ফুলতলা উপজেলার খানজাহান আলী থানাধীন মশিয়ালী গ্রামে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তিন ভাই কর্তৃক তিনজনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি (আরও একজন বিক্ষুব্ধ জনতার পিটুনিতে নিহত হয়) ফের প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, ক্ষমতার সুশীতল ছায়ায় এমন কত বলবান দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন? ওই মর্মন্তুদ ঘটনার কয়েকদিন পরও সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে, খুলনার তিন খুনের নায়ক তিন ভাই- শেখ জাকারিয়া, শেখ মিল্টন ও শেখ আফরিন এলাকায় দাপিয়েই শুধু বেড়াচ্ছেন না, আরাম-আয়াসেই আছেন। তাদের নামে আরও কয়েকটি পুরোনো মামলা রয়েছে, যেগুলো ঠুনকো অভিযোগে দায়ের করা নয়। কিন্তু দলের বলবানদের আশীর্বাদ ও প্রশাসনের দাপুটে অসাধুদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে ওই তিন ভাই এলাকার ত্রাস হয়ে আছেন।

এই শেখ জাকারিয়ারা এক দিনে সৃষ্টি হয় না। এদের সংখ্যাও কম নয়। প্রায় সারাদেশেই এরা আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। অনেকেরই হয়তো স্মরণে আছে, ১৯৮২ সালে জিয়া সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী আবুল কাশেমের বাসভবন থেকে ইমদু নামের এক কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তার করেছিলেন। এটি একটি মাত্র দৃষ্টান্ত। এমন ইমদুরাও সব সরকারের আমলেই বিভিন্নভাবে মন্ত্রী-এমপি কিংবা দলীয় ক্ষমতাবানদের ছায়াতলে আরামে-আয়াসে থাকে। যে রাষ্ট্র কিংবা সমাজে ক্ষমতার দাপটে এমন কদর্যতা সৃষ্টি হয়, সেই দেশ বা সমাজ দুর্বৃত্তদের অভয়ারণ্য হবে এটিই স্বাভাবিক। বর্তমান সরকার টানা তিন মেয়াদের ধারাবাহিক সরকার। এই সরকারের বিশেষ করে সরকারের নির্বাহী প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’র অঙ্গীকার রয়েছে। এও অসত্য নয় যে, অনিয়ম-দুর্নীতি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার নির্দেশেই অভিযানও চলমান রয়েছে। কিন্তু তার পরও যেন এসবের রাশ টানা যাচ্ছে না? এর উত্তরও জটিল নয়।

একজন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দশভুজা নন। তার একার পক্ষে সব দিকে নজর রাখাও কঠিন। তাছাড়া তা তাকে করতেই বা হবে কেন? একটি সরকারের মন্ত্রিপরিষদসহ বিভিন্ন অর্গান আছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, সরকারের অর্গানগুলো কি ঠিক ঠিকভাবে কাজ করছে? এ প্রশ্নের উত্তরটাও প্রীতিকর নয়। যদি দায়িত্বশীল সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিষ্ঠ হতেন, তাহলে আমাদের কাঙ্ক্ষিত আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথ নিশ্চয়ই মসৃণ করা কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়াত না। ক্যাসিনো বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত অনেক রাঘববোয়ালের নামই শুনেছিলাম। পাপিয়ার সঙ্গেও আওয়ামী লীগসহ নানা মহলের কয়েকজন হোমরা-চোমরার নাম শুনেছিলাম। কিন্তু সবকিছুই যেন মিইয়ে গেল। দুস্কর্মকারীরা অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের সমাজে কেন থাকে দুধে-ভাতে কিংবা আরামে-আয়াসে? আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি অহরহ ব্যক্ত করেন সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী কিংবা সরকারি দলের অনেক নেতা। উল্লিখিত বিষয়গুলো কি সাক্ষ্য দেয়- আইনের শাসনের পথ এদেশে মসৃণ? যদি আইনের শাসনের পথ মসৃণ হতো তাহলে শামীম-সম্রাটরা এভাবে থাকতে পারত না। অন্ধকারের ছায়া বিস্তৃত হতো না। দূর হোক অন্ধকার আর কদর্যতা। সমাজবিরোধীদের আরাম-আয়াসের পথ রুদ্ধ হোক।

লেখক ও সাংবাদিক
https://samakal.com/editorial-subeditorial/article/200731701/

Facebook Comments

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০