বৃহস্পতিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সব

Singapore
Corona Update

Confirmed Recovered Death
57,639 57,291 27

Bangladesh
Corona Update

Confirmed Recovered Death
353,844 262,953 5,044

করোনাক্রান্ত অভিবাসীর ডায়েরী ৩

করোনায় ভীত হওয়ার কিছু নেই, মনে সাহস রাখবেন

কিরণ মাহমুদ মান্না | ২৩ জুলাই ২০২০ | ১২:৫৭ অপরাহ্ণ
করোনায় ভীত হওয়ার কিছু নেই, মনে সাহস রাখবেন

১৫ই এপ্রিল থেকেই রুমে। ঐদিনই শুনলাম আমাদের কোম্পানির একজন এবং আমাদের হাউসে বসবাসরত অন্য কোম্পানির দুইজনের করোনা শনাক্ত হয়েছে আমাদের ডরমিটরিতে। সে থেকে ভয়ে ভয়ে সময় কাটাই। এক সপ্তাহ পর আমার রুমমেট এক রাতে জ্বরে হঠাৎ কান্নাকাটি শুরু করে। সকালে তাকে বুঝিয়ে সিকিউরিটিকে বলে হাসপাতালে নেয়ার পর আমরা জানতে পারি তারও নাকি পজিটিভ। সে করোনায় আক্রান্ত! কি উপায়। একসাথে খাওয়া দাওয়া, কথা বলা রুমের অনেক কিছুই শেয়ার করা হয়েছে তার সাথে। অনেক দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই আমরা সবাই। ২৬ এপ্রিল রবিবার রাতে তারাবীর নামাজ পড়লাম। বেশ ভালই ছিলাম। তারাবীর নামাজ পড়ার পরে রুমমেটকে বললাম আমার মাথাটা হঠাৎ করে কেমন যেনো চেপে ধরলো। মনে হচ্ছে জ্বর আসবে। আমার কথা শুনে রুমমেট দুইজন ঘাবড়ে গেল বুঝতে পারলাম। রাতে খুব জ্বর অনুভব করলাম। রাতে থরথর করে জ্বরে কেঁপে উঠলে বিছানার টাওয়েল উঠিয়ে নিজেই গায়ে দেই। এ অবস্থা নিয়েও ভোর রাতে উঠে সেহরী খাই। ফজর নামাজ পড়ার পরে জ্বর আরো বাড়তে থাকে, ভাবলাম সকাল হতে এখনো যেহেতু অনেক সময় রয়েছে তাই চেষ্টা করলাম একটু ঘুমাই। চোখে জ্বালা পোড়া করছে কিন্তু ঘুম আসছে না। বিছানায় শুয়ে কাঁপছি আর ছটফটিয়ে কাটাচ্ছি সময়। কোন মতে ৯টা পর্যন্ত এসে কাঁপতে কাঁপতে গোসল করলাম। ভাবলাম শরীরটা ঠান্ডা হবে। না তবুও ঠান্ডা হলো না। পরে রুমের ওদের ডেকে বলি আমার সমস্যা হচ্ছে। তারা সিকিউরিটিকে ডাকলো, আমি সিকিউরিটিকে আমার সমস্যার কথা বললাম। সিকিউরিটি বললো তাড়াতাড়ি নিচের সিক-বে রুমে অপেক্ষা করতে। সে অ্যাম্বুলেন্স কল করছে। আমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নিচে অপেক্ষা করি। আর সে ফাঁকে আমার কোম্পানির কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত জানাই। আধা ঘন্টা পরে অ্যাম্বুলেন্স চলে আসলো, আমায় নিয়ে এলো জুরং ইস্ট টেং ফং জেনারেল হাসপাতালে। আসার পর নার্স দুটি প্যারাসিটামল দিলো, খেয়ে বসে থাকি অনেকটা সময়। ঔষধ খাওয়ার আধা ঘন্টার মধ্যে শরীর ঠান্ডা অনুভব করলাম। বুঝতে পারলাম জ্বর চলে গেছে। পরীক্ষা নীরিক্ষা করার পরে প্রাথমিক রিপোর্ট ধরা পরে আমার কোভিট-১৯ পজিটিভ। রিপোর্ট শোনার পর আমার কান দুটি ঝিম ধরে যায়। শরীরে আবার গরম অনুভব করি। পরে আমাকে হাসপাতালের বেসমেন্টে নিয়ে এলো। সিট দেখিয়ে দিয়ে বললো এখানে থাকতে হবে কিছু দিন। আর ঠান্ডা জ্বর কাশির ঔষধ দিলো। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের বেসমেন্টেই পজিটিভ রোগীদের অস্থায়ী বাসস্থান গড়েছে। সেখানে এসে দেখি শত মানুষ বেডের উপর শুয়ে, কেউ বসে কেউ হেঁটে সময় কাটাচ্ছে। এমন পরিবেশ দেখে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেলো। যাক সেখানে দুই রাত এক দিন থাকার পর আমাকে হাসপাতালের কেবিনে আনা হলো। কেবিনের পরিবেশটা খুব ভালো ছিল। বড়সড় একটা রুমে চারজন। কেবিনে আসার পর নার্স এসে চেক-আপ করলো। পরে একজন ডাক্তার এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে বললো, সমস্যা নাই কোন একদম চিন্তা করবেন না। সব ঠিক আছে। ডাক্তারের কথা শুনে একটু আস্থা পেলাম। তারপর থেকে রোজ সকালে একবার করে ডাক্তার এসে দেখে যায়। আর নার্সেরা দিনে রাতে কয়েকবার চেক-আপ করে। আমি কখনো দুর্বল হয়ে পড়িনি। সবসময় নিজেকে শক্ত রেখেছি। নার্সরা চেক-আপের পাশাপাশি তিন বেলা খাবার দিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরপর ফোন করে জানতে চায় আমার কোনকিছুর প্রয়োজন আছে কি না। তবে পরবর্তী টেস্ট না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না। টেস্টে যদি নেগেটিভ আসে তবেই হাসপাতাল থেকে আবার এ·পোতে প্রেরণ করবে কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য। বুঝতে পারি আমার রুম থেকেই ভাইরাসটি আমাকে আক্রমণ করেছে। আমার এই বয়স অবধি শেষবার কবে জ্বর এসেছিল আমার ঠিক মনে পড়ে না।
হাসপাতালেই আমার জন্মদিন
১ মে সকাল ৭টায় ঘুম থেকে জেগে বিছানায় বসেই মোবাইল ব্রাউজ করছিলাম। এমন সময় হাসপাতালের ল্যান্ড ফোনে নার্সের কল। Hello, Mr Mahmod, Good morning sir. How are you? Happy birthday to you. Today your birthday right?? নার্সের মুখে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পেয়ে হঠাৎ অবাক হয়ে গেলাম। ভাবলাম ওরা কিভাবে জানলো আজ আমার জন্মদিন? আবার খেয়াল করলাম হাসপাতালে তো আমার সব ডিটেইলস আপডেট করা আছে। সেই জন্যেই জানতে পারে। যদিও আমার জন্মদিন নিয়ে কখনো কোনদিন আহামরি কিছুই ভাবিনি। কিছুক্ষণ পরে নার্স চেক-আপ করতে আসলো। আমি শুয়ে আছি আর সে প্রেসার এবং টেম্পারেচার চেক করে গেলো। পরে সকালের নাস্তা এবং ঔষধ, গড়গড়া করার জন্য এককাপ ঔষধ এনে দিলো। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা ও ঔষধ খেয়ে নেই। নাস্তা শেষে বেডের পাশে চেয়ারে বসে মোবাইলের নোটিফিকেশন খুঁজতে থাকি দেখি কে কে আজ আমাকে উইশ করলো! কিন্তু কাউকে পেলাম না আমার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর মতো। এমন সময় চোখে পড়লো আমার প্রাণের গ্রুপ, আড্ডার গ্রুপ, কবিকণিকা থেকে প্রিয় ভাই/বন্ধু শাহরিয়ার মাসুম জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে স্ট্যাটাস পোস্ট করেছে। মেসেঞ্জারে আরো কিছু আপু/ভাইয়েরা আমার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। আনন্দে চোখ জলে ভরে গেল একমুহূর্তেই। তারপর একটা স্ট্যাটাস পেলাম কবিকণিকার প্রিয় এডমিন কাকলী আফরোজ আপুর। আপুর সাথে কথাও হলো। আজ আমি হাসপাতালে। এই সময়ে কবিকণিকার প্রত্যেকটা মানুষ আমার জন্য অনেক দোয়া চেয়ে কান্নাকাটি করেছে আল্লাহ দরবারে। অনেকেই প্রতিদিন মেসেঞ্জারে কল করে ম্যাসেজ করে আমার শারীরিক অবস্থা জানতে চায়। আমার খুব খুব ভালো লাগলো তাদের সবার আন্তরিকতা দেখে। আমি তাদের আপন কেউ না তবুও তাদের কাছে আমি অতি আপনেরও আপন। এই অল্প সময়ে কবিকণিকা গ্রুপের সকলের ভালোবাসা পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। সকাল ১১ টা ৩০ মিনিটে নার্স দুপুরের খাবার দিয়ে গেলো ভাত, মাছ এবং সবজি। আমাকে পুনরায় চেক-আপ করে গেলো। আমি নার্সকে কল করে হাসপাতালের ইউনিফর্ম আর টাওয়েল চেয়ে নিয়ে গোসল করতে গেলাম। গোসল সেরে খাবার ও ঔষধ খেয়ে বসে আছি। দুপুর ২টার দিকে একজন নার্স এসে খাবার টেবিল রুমের মাঝখানে নিয়ে বললো- brother, come here. Today your birthday right? So we all wishes to you.
অমনি দেখি দরজা খুলে ১০/১৫ জন নার্স একটা কেক নিয়ে হাজির। সবাই একসাথে করতালি দিয়ে বলে উঠলো HAPPY BIRTHDAY TO YOU। আমি তাদের এই আন্তরিকতা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। সেকি ওরা এভাবে আমার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবে কখনো কল্পনাও করিনি। আমি শুধু ভেজা ভেজা চোখে, হাসিমুখে দুই হাত করজোড়ে ধন্যবাদ জানালাম। বুঝতে পারলাম, একজন রোগীকে ওরা কখনো ঘৃণার চোখে দেখে না। সে হোক করোনা রোগী বা হোক যে কোন রোগী। জানতে ইচ্ছে করে বিধাতার কাছে এরা আসলো কোন মাটির তৈরি? এত সুন্দর এদের আচরণ, এত সুন্দর সেবা যত্ন। সত্যি অতুলনীয়।
আমার জন্মদিনে কখনো কোনদিন তিন চার জনের বেশি মেসেঞ্জারে উইশ করেনি। কিন্তু এই বছর আমি হাসপাতালে অনেক বন্ধু-বান্ধব মেসেঞ্জারে উইশ করেছে অথচ তাদের সাথে আমার শুধুমাত্র লেখালেখির পরিচয় থেকেই বন্ধুত্ব। আমি তাদের সবার কাছে চিরকৃতজ্ঞ আমাকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য। সবার সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করছি।
হাসপাতালে থেকে বাড়িতে পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। পরিবারের সবাই আমার জন্য অনেক কান্নাকাটি করছে। আমি যে ভালো আছি সেটা তাদেরকে বুঝাতেই পারি না। তারা মনে করে হাসপাতালে আছি না জানি আমার কি হয়েছে। কিন্তু সিঙ্গাপুরের উন্নত চিকিৎসায় অনেক আক্রান্ত রোগী সুস্থ্য হচ্ছে। বর্তমানে বেশ ভাল আছি হাসপাতালে। শারীরিক দিক দিয়ে সুস্থ্য আছি। বাকিটা আল্লাহ ভরসা। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।

Facebook Comments

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০