বুধবার, ২৮শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সব

Singapore
Corona Update

Confirmed Recovered Death
57,980 57,883 28

Bangladesh
Corona Update

Confirmed Recovered Death
401,586 318,123 5,838

জীবন ও জীবিকা

মো. আহসান হাবিব দেওয়ান | ০৭ জুন ২০২০ | ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
জীবন ও জীবিকা ফাইল ছবি

একটা দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে গেলো নাহেলার। আজ থেকে আট বছর আগে ফজর ওয়াক্তে ঠিক এমনি একটি দুঃস্বপ্ন দেখেছিলো সে। সে বারের সে স্বপ্ন দেখার কয়েকদিন বাদে তার প্রাণপ্রিয় সহজ সরল আত্মার ভালো মানুষটিকে আল্লাহ পঙ্গু করে বিছানায় শায়িত করে রেখেছেন। অতি সৎ কর্মঠ স্বামী বশির, ছেলে তিক্ত ও মেয়ে তনুকে নিয়ে ছিল নাহেলার ছোট্ট সংসার। আর্থিক টানাপোড়েন থাকলেও ভালোবাসার প্রাচুর্যে সুখেই ছিল নাহেলা। স্বামী একটি লোকাল বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করতো।

মাসিক যা বেতন পাইতো অনেক হিসাব নিকাশ করে খরচ করে তাতে চলে যেত তাদের। প্রতিদিন অফিস শেষে ঠিক একই সময়ে সোজা ঘরে ফিরত বশির। যেদিন মন ভালো থাকতো বাড়তি বাজার কিছু করে এনে দূর পথ থেকে আদরের সুরে নাহেলা নাহেলা বলে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকতো।

স্বামীর এমন ডাকে সে বুঝতে পারতো আজ তার পছন্দের কিছু বাজার এসেছে ঘরে। বিয়ের পথ থেকে কোনো দিন অসহায় ঘর্মাক্ত মানুষটিকে কখনো বিষন্ন দেখেনি নাহেলা, সারাক্ষণ মুখ জুড়ে লেগে থাকতো আনন্দের ফুলকি। দরজা খুলে হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে সাহায্য করতো প্রতিদিন। ঘরে ঢুকে স্বামীর কাছে বসে সারাদিনের ঘটে যাওয়া সব গল্প শুনতো। এরপর বাচ্চা দুটি সাথে নিয়ে ঘরে আড্ডা জমতো, হাসি তামাসা হতো।

ফাঁকে ফাঁকে চলতো কিছু খানাপিনা। নিয়ম মত বাদ মাগরিব নাহেলার স্বামী বশির তার ছেলে মেয়ে দুটিকে নিয়ে পড়াতে বসত, নিজের মেধা সব উজাড় করে দিতো বাচ্চাদের বুঝানোর জন্য। বাচ্চাদুটি মনোযোগ দিয়ে শুনতো ও বুঝার চেষ্টা করতো। বশির মাঝে মাঝে ছেলেমেয়েকে বলতো, আমি নিতান্ত গরীব কৃষকের সন্তান ছিলাম তাই লেখাপড়ায় তেমন এগুতে পারিনি কিন্তু প্রিয় সন্তানেরা আমি তোমাদেরকে আমার মতো অর্ধশিক্ষিত করে রাখতে চাই না আমার যত কষ্টই হোক আমি তোমাদেরকে উচ্চ শিক্ষিত করে আমার অপূর্ণ ইচ্ছাগুলি তোমাদেরকে দিয়ে পূরণ করতে চাই। তোমরা লেখাপড়া শিখে জ্ঞান অর্জন করে অনেক বড় হবে, সমাজ ও মানুষের উপকার করবে, মর্যাদাশীল হবে আমি হবো গর্বিত। ছেলে বাবার সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে হয়ে উঠেছিল বাবার এক অনুগত শিষ্য। চেহারা, আচার আচরণে ছেলে তিক্ত সত্যিই ছিল বাবার কার্বনকপি।

কোন এক ছুটির দিনে স্বপরিবারে বশিরের এক সহকর্মীর বাসা থেকে মধ্যহ্নভোজের দাওয়াত শেষে সবাই এক সাথে হেঁটে বাসায় ফিরছিলো। পথিমধ্যে হঠাৎ বশির বুকে হাত চেপে বসে পড়লো। সবাই এগিয়ে এসে ধরাধরি করে তাকে অদূরেই একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে গেল। ডাক্তার বললেন ব্রেইন স্ট্রোক ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়েছে। সম্পূর্ণরূপে ভালো হতে হলে দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসা ও যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। নাহেলার আর্থিক সঙ্গতিহীন সংসারে এমন চিকিৎসা আর সম্ভব হয়নি।

সহায় সম্পদ যা ছিল তা দিয়ে দেশে সাধ্যমত চেষ্টা করে তাকে আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলেন কিন্তু পঙ্গুত্ব হলো তার চিরদিনের সাথী। এতেই শুকরিয়া করেন নাহেলা এই ভেবে যে হয়তো আল্লাহ ইহার মধ্যেই মঙ্গল রেখেছেন। এর মধ্যে বাবার এই অসহায় অবস্থায় সংসারের হাল ধরলো তিক্ত। এ কাজ সে কাজ করে সংসারে প্রয়োজন মেটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে গিয়ে তার লেখাপড়ার যবনিকাপাত ঘটলো। মায়ের মলিন মুখে সুখের হাসি ফোটানো, বোনের অনাগত ভবিষ্যৎ, পিতার সুচিকিৎসার কথা ভেবে যেখানে যা অবশিষ্ট ছিল সমস্ত বিক্রি করে সর্বোপরি কিছু ধার দেনা করে একদিন দূর প্রবাসে পাড়ি জমালো।

দেখতে দেখতে এর মধ্যে স্বজনহীন প্রবাসে তিক্তের গত হয়েছে ছয়টি বসন্ত। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে তিক্তের চেহারায় বয়সের তুলনায় বাড়তি বয়সের ছাপ পড়ে গেছে। সেই ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে, এবাদত বন্দেগি করে নাস্তা ও দুপুরের খাবার রেডি করে নিয়ে কাজে যায়, কাজ শেষে সান্ধ্যকালীন পার্টটাইম লেখাপড়া করে তাই ইনস্টিটিউট এ যেতে হয়, ক্লাস থেকে ঘরে ফেরে রাত এগারোটায় তারপরে গোসল সেরে প্রতিদিন জামা-কাপড় পরিষ্কার ও রান্না করতে হয়।

রাতের খাবার ও পরের দিনের খাবারের ব্যবস্থা করে রেখে আবার কিছু পড়াশোনা করতে হয়। রাতে শোয়ার আগে দেশে মা, অসুস্থ বাবা ও ছোট্ট বোনটির খোঁজখবর নিয়ে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় যায়। গত ছয় বছর ধরে সংগ্রামের এ রুটিনে তিক্তের একটুও হেরফের হয়নি কখনো। প্রবাস জীবনের প্রতিষ্ঠা ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ভোগের পেছনে কত সহস্র দিনের সুখ বিসর্জন যে দিতে হয় তিক্ত তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে এই প্রবাসকালে। তারপরও তার তৃপ্তি যে সে বাবার উপদেশ রক্ষার্থে এখনো লেখাপড়া করতে পারছে মায়ের মুখের হাসি ফোটাবার, বোনের ভবিষ্যতে গড়বার বাবার সুচিকিৎসা করবার স্বপ্ন দেখছে দুচোখ ভরে। এভাবে একদিন সে সব গুছিয়ে নেবে। মা ফোনে করলেই তাকে অনেক দুআ করেন। সব ধার দেনা শোধ হয়েছে। বাড়তি কিছু সম্পদও মা করেছেন। ব্যাংকে কিছু টাকাও জমিয়েছেন। ছোট বোন তনু ভালো একটা স্কুলে পড়ছে। অসুস্থ বাবার ঔষধ কেনার পয়সারও আর টানাটানি হয় না। বিদেশ আসার আগে যে দৈন্য স্পর্শ করেছিল তার দাগ মুছে গেছে কিছুটা। জীবন ও জীবিকার সংগ্রামে সে অনেকটা সার্থক। তিক্তের কঠোর পরিশ্রম ও মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় নাহেলার কুঁচকে যাওয়া সংসার এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। দিন বদলের সাথে সাথে বদলে গেছে অনেক কিছু।

নিশ্চিতেই ছিল নাহেলা কিন্তু আজ সুবহে সাদেকের সময় খুব পরিচিত এক দুঃস্বপ্ন নাহেলার আত্মাকে যেন দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে গেলো। ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে আল্লাহর দরবারে দুহাত তুলে তার প্রবাসী ছেলের জন্য দুআ করতে লাগলো,‘হে বিধাতা, হে পাক পরওয়ারদেগার তুমি আমার কলিজার টুকরা সোনার ছেলেটাকে কোনো বিপদে ফেলো না মাবুদ। তুমি স্বপ্নে দেখালে ছেলেটা আমার অসুস্থ। তুমি আমাকে দেখানো সে স্বপ্নটাকে মিথ্যা করে দিও। আমার কলিজার টুকরা বুকের ধনকে সংসারের অভাব অনটন থেকে মুক্তির আশায় এত অল্প বয়সে বিদেশ পাঠিয়েছি। তুমি তাকে হেফাজত করো মালিক।

এই বয়সে ওর মতো ছেলে লেখাপড়া করে। বন্ধুবান্ধবদের সাথে আনন্দে ঘুরে বেড়ায়, খেলাধূলা করে। ছেলেটা আমার সংসারের হাল ধরেছে। বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা ভেবে সে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে প্রবাসে পাড়ি দিয়েছে। হে মহান আল্লাহ তুমিই একমাত্র ভরসা। ওই প্রবাসে তুমি ছাড়া আপনজন আর কেউ নেই। তুমি আমার কলিজার টুকরাকে সুস্থ রেখো মাবুদ। মুনাজাত শেষে নাহেলার মনে অশান্তি ভর করে। বসন্তের খাখা দুপুরের ঝাঁঝালো হাওয়ায় ক্লান্তি মোড়ানো মাঠে পোড়া তৃষিত মানবের মতো যেন ভেতরটা হাহাকার করছে। ভালো লাগছে না কিছুতেই। যেন হারিয়ে গেছে নিজের অজান্তে কোনো কিছু কোনোখানে। মায়ের এমন অবস্থা দেখে ছোট্ট মেয়ে তনু জিজ্ঞাসা করে ‘মা’ তোমাকে এমন উদাস দেখাচ্ছে কেন? মা, মেয়েকে বলে আজ কয়দিন হয়ে গেলো তিক্ত কল দেয় না। রাতে স্বপ্নে দেখলাম সে অনেক অসুস্থ, অনেক জ্বর। ভুল বকছে। এই বলে অঝোরে কাঁদতে থাকে নাহেলা। শিশুসুলভ তনু তার মাকে জড়িয়ে ধরে সহজ সরল সান্ত¡না দেয় ভাইয়া ভালো আছে মা। তুমি প্রতিদিন তার চিন্তা করো, তার কল্পনা করো, সে কল্পনাগুলি স্বপ্নে দেখেছো। স্বপ্ন তো স্বপ্ন, তা কি সত্য হয় নাকি। দুশ্চিন্তা করো না। ভাইয়া ভালো আছে। ভাইয়ার পারমিট শেষ, আর কয়েক দিনের মধ্যে চলে আসবে, সে তো আগেই বলেছে। হয়তো এমন হবে আমাদেরকে না জানিয়ে এসে আমাদেরকে সারপ্রাইজ দেবে। আমার সাথে শেষ যেদিন কথা হয় সেদিন আমার কাছে ভাইয়া জানতে চেয়েছিলো আমার কি কি লাগবে, আমি সব বলে দিয়েছি। হুম।

দেখো হুট করে ভাইয়া এগুলি নিয়ে হাজির হবে। তনুর কথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও বুকের ভেতরটা এক অজানা আশংকায় আচ্ছন্ন। আজ কত দিন তিক্ত প্রবাসে। কতদিন দেখি না বাবাটার মুখখানি। বাবাটা আমার অনেক কষ্ট করে। আর্থিক অনটন, তার বাবার অসুস্থতার কারণে দৈন্য সংসারে নিত্যদিনের সাথী ছিল বলে দেশে লেখাপড়া করতে পারেনি। প্রবাসে হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পরও পার্টটাইম লেখাপড়া করে। কি আমার লক্ষী ছেলেটি। ভাবতে ভাবতে নাহেলার চোখে অশ্রু ঝরে। এভাবেই দিন যায়। মাঝে মাঝে বিছানায় পড়ে থাকা অসুস্থ বশির অস্পষ্ট স্বরে নাহেলাকে জিজ্ঞাসা করে, তিক্ত আর কল করেছিল নাহেলা। আমার কথা জিজ্ঞাসা করেছিল কিছু? তিক্ত আমার সাথে অনেক দিন কথা বলছে না কেন? ছেলেটা কি আমাকে ভুল বুঝেছে নাহেলা। তনু বললো, সে নাকি দুচার দিনের মধ্যে আসবে। তিক্ত আসলে আমাকে বড় ডাক্তার দেখাবে তাই না। আমি আবার সুস্থ হবো। আল্লাহ আমার বাবাটাকে অনেক বড় করুক! স্বামীর কথা শুনে নাহেলা অশ্রু মুছে আরো কয়েকটিবার। মুমূর্ষু স্বামীর কাছে গিয়ে বসে তাকে বলে হা গো। সে চলে আসবে। বলেছে এসে তোমাকে বড় ডাক্তার দেখাবে। প্রাণ ভরে দুআ করো যেন সে সুস্থতার সাথে দেশে ফিরে আসে। নাহেলা সবার কাছে ঠিক থাকলেও মনের মধ্যে একাকী ভোগ করে অশান্তির ঝড়। পৃথিবীর সকল মায়ের পবিত্র মন সন্তানের জন্য ব্যাকুল থাকে। মায়ার বিনা সুতার বন্ধনে আত্মার এ যেন এক অলৌকিক বিধাতা প্রদত্ত টান, সন্তানের কোন আপদ মছিবতের সংবাদ মায়ের মনকে নাড়া দিয়ে জানিয়ে দেয় সন্তানের তথাকার অবস্থান। নাহেলাও তেমনি একজন মাতা। কিছুতেই শান্তি পায় না। সে শুধু দুহাত তুলে বিধাতাকে ডাকে, ‘হে বিধাতা তুমি আমার সন্তানকে কোনো বিপদে ফেলো না মাবুদ! শুধুই আল্লাহর উপর তার ভরসা। এভাবে দুর্ভাবনা আর নিদ্রাহীন কেটে যায় আরো দুই তিন সপ্তাহ। কোন এক দ্বিপ্রহরে দরজায় কড়া নাড়ার ঠকঠক আওয়াজ শুনে বের হয়ে দরজা খুলে তনু। ডাকপিয়ন ধবধবে সাদা খামে মোড়ানো এক চিঠি হাতে দিয়ে বিদায় নেয়। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে মাকে লেখা এক প্রবাসী ছেলের চিঠি। নার্সকে তার শেষ অনুরোধ ছিল ‘অনুগ্রহ করে এই চিঠিটি যদি উল্লেখিত ঠিকানায় আমার দুঃখিনী মায়ের কাছে পোস্ট করে দাও আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকবো’ নার্স নিজ খরচে সে চিঠিটি পোস্ট করে।

চিঠিতে লিখেছে:

তাং ২৩/০৩/২০২০ ইং
শ্রদ্ধেয় মা,
আমার শত সহস্র সালাম ও কদমবুচি গ্রহণ করো। আশা করি সবাইকে নিয়ে বেশ ভালো আছো। আমি ভালো নেই মা। তোমাদেরকে তো বলা হয়নি, আমার শরীরে কোভিড-১৯ ভাইরাস পজিটিভ ধরা পড়েছিল সে কারণে গত দেড় মাস হসপিটালের একটি ঘরে আবদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছি। তোমাকে বলেছিলাম এবার আমার ডিপ্লোমা কোর্সটা শেষ হলে পারমিট ক্যানসেল করে দেশে আসবো। কোর্স শেষ করেছি, গতকাল ছিল আমার পারমিটের শেষ দিন। সুস্থ থাকলে হয়তো আজ আমি দেশে ফিরতাম। আজকের এ দিনটা হয়তো আনন্দেই তোমাদের সাথে কাটানো হতো কিন্তু বিধি বাম “করোনা” নামক এই ভাইরাস তোমাদের কাছে আমাকে আর ফিরতে দিলো না। তোমরা কষ্ট পাবে, দুশ্চিন্তা করবে ভেবে কথাটা গোপন রেখেছিলাম যে সুস্থ হয়ে উঠলে তোমাদেরকে জানাবো কিন্তু দিন দিন অসুস্থতা আমাকে অসহায় মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেলো। 

আজ খুব বেশি মনে পড়ছে মা তোমাদেরকে। এই হসপিটালের ছোট্ট বেডটিতে উপুর হয়ে শুয়ে যন্ত্রণা কাতর দেহ ও অশান্ত মনটাকে হালকা করার জন্য এই একটুকরো কাগজে অনেক কষ্টে লিখছি এ চিঠিটা। সান্ত¡না এই যে ধরিত্রীমাকে কিছু জানিয়ে গেলাম শেষ বারের মতো। এই চিঠি লিখছি হয়তো তোমাদেরকে পাঠাতেও পারবো না। গত কয়েকদিন ধরে কোন কিছুই খেতে পারছি না মা, পেটে ব্যথা অনুভব করছি, গায়ে জ্বর, গলাবদ্ধতা ও শ্বাসকষ্ট প্রচন্ড বেড়েছে, বুকটা চেপে ধরে আসছে। কাউকে যে নিজের কথাগুলি বলবো সেটাও বলতে পারি না। বিধাতার দুনিয়াতে বেঁচে থেকে এ মানবেতর কঠিন আজাব নিজে ভোগ না করলে হয়তো বিশ্বাস করতাম না মা। মাগো এ আল্লাহর গজব ছাড়া মনে হয় আর কিছুই নয়। নিশ্চয় হয়তো কোনো পাপের শাস্তি আজ আমি ভোগ করছি। করোনার কঠিন আজাব যেন কোনো শত্রুকে ও আল্লাহ না দেন!

আজ এই একাকীত্বে কঠিন শয্যায় খুব মনে পড়ছে আমার আদরের ছোট্ট বোন তনুর কথা, ওর জন্য ওর পছন্দের অক্সিডাইজ ডায়ালের প্ল্যাটিনাম প্লেটেড চেইনের ঘড়ি, ওর পছন্দের ব্যাগ ও চকলেটগুলি কিনে আমার ব্যাগেজে ভরে রেখেছিলাম হয়তো আর দেওয়া হবে না। আমি হসপিটালে আসার দুদিন আগে ফোনে ওর সাথে আমার শেষ কথা যখন হয়েছিল সে বলেছিলো, ভাইয়া তুমি আসলে নানু বাড়িতে যাবো কত দিন তোমার সাথে কোথাও যাওয়া হয় না, নানুমনি তোমার লাগানো গাছের পেয়ারাগুলিকে সাদা কাপড় মুড়িয়ে রেখেছে তুমি আসলে দুজনে গাছ থেকে পেড়ে খাবো বলে, নানু প্রতিদিন কল করে আমাকে জিজ্ঞাসা করে কবে আসবে তুমি। নানুদের ওখানে নতুন সুপার মার্কেট হয়েছে তুমি আসলে দুজন মিলে যাব সেখানে। তোমাকে ছাড়া আমার কোথাও যেতে ভালো লাগে না ভাইয়া ! তনুকে আমি কথা দিয়েছিলাম ফিরে এসে ওকে সাথে করে নিয়ে নানু বাড়ি যাবো, সুপার মার্কেটে যাবো, সে যা চাইবে তাই কিনে দেব কিন্তু তা আর হবে না মা। ওকে বলো, আমাকে সে যেন ভুল না বুঝে। আমার গর্হিত এ অপারগতায় আমি অত্যন্ত দুঃখিত, আমাকে যেন সে মাফ করে দেয়। তোমাদের জন্য আজ খুব মন খারাপ মা। বাইরে থাকলে, সুস্থ থাকলে হয়তো ভিডিও কল করে তোমার চেহারাটা দেখে নিতাম। জানো মা রাতের ঘন আঁধার যখন নেমে আসে, তখন তোমার চেহারাটা ভেসে ওঠে। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে মা। চোখ বন্ধ করলেই যেন তোমাকে দেখি, বাস্তবে তোমাকে না দেখার চাপা কষ্টে চোখের জল গাল বেয়ে ঝরে। আমার প্রবাস জীবনের এমন কোনো রাত নেই যে তোমাদের সাথে কথা না বলে ঘুমাতে গেছি, অথচ আজ কত দিন হলো তোমাদের সাথে আমার কোনো কথা হয় না। নিশ্চয় তুমি দুশ্চিন্তা করছো, হয়তো অভিমান করছো, হয়তো ভুল বুঝে রাগও করছো। আমি হসপিটালের এই ছোট্ট বেডটিতে এতদিন করোনা ভাইরাস নামক এ মানব শত্রুকে হার মানাতে গিয়ে পরিস্থিতির চাপে তোমাদেরকে ভুলে থাকতে বাধ্য হয়েছি। আমি নিরুপায়। আমাকে ভুল বুঝো না মাগো!

বাবার সাথে তোমার ও তনুর তোলা সে ছবিটি আমার মানিব্যাগে ছিল। এই একাকিত্বের দূর প্রবাসে ওই ছবিটা ছিল আমার প্রিয় সম্পদ। তোমার হাতের যে বালা দুটি বিক্রি করে আমাকে বিদেশ পাঠিয়েছিলে নিজের হাতে তোমার হাতে পরিয়ে দেব বলে অনেক সুন্দর দুটি বালা কিনে রেখেছিলাম, বলিনি তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে, কিন্তু সে সারপ্রাইজ হয়তো আর কোনোদিন দেওয়া হবে না আমার। অনাকাক্সিক্ষত নিগৃহীত এ মৃত্যুর কাছে হয়তো আমাকে পরাজিত হতে হবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে। চিঠি লেখার প্রাক্কালে বুকের ব্যাথার কষ্ট আরো বেড়ে গেছে ইতিমধ্যে। ভেবেছিলাম দেশে ফিরে বাবাকে ভালো ডাক্তার দেখাবো। কিন্তু আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্তদের ভাগ্য কখনোই সুপ্রসন্ন হয় না। উপরে ওঠার জন্য এতটা সিঁড়ি পেরিয়ে এসে জীবনের যবনিকাপাত ঘটবে ভাবতে অনেক কষ্ট হচ্ছে মা। বাবার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। বাবাকে বলো ইহজীবনে বুঝে না বুঝে হয়তো কত কষ্ট দিয়েছি, হয়তো কত অপরাধ করেছি, হতভাগা এ সন্তানটিকে যেন ক্ষমা করে দেন। তনুকে দেখে রেখো মা। তুমি ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করো। আমার সাথে হয়তো আর কোনোদিন তোমাদের দেখা হবে না। মাফ করে দিও। ভালো থেকো। অনেক অনেক ভালো!

ইতি
তোমার হতভাগ্য ছেলে
তিক্ত
লেখক: মো. আহসান হাবিব দেওয়ান, সিঙ্গাপুর প্রবাসী ব্যবসায়ী ও কম্যুনিটি এক্টিভিস্ট

Facebook Comments

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১