শুক্রবার, ১২ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

সব

Singapore
Corona Update

Confirmed Recovered Death
59,879 59,746 29

Bangladesh
Corona Update

Confirmed Recovered Death
543,717 492,059 8,356

দারিদ্র্যতা ও উপরি খ্যাতির দ্বৈত জীবন!

বাংলার কণ্ঠ ডেস্ক | ০২ আগস্ট ২০২২ | ৩:২২ অপরাহ্ণ
দারিদ্র্যতা ও উপরি খ্যাতির দ্বৈত জীবন!

কথায় বলে ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’। এতদিন এটিকে প্রবাদবাক্য মনে হলেও তার চাক্ষুস প্রমাণ পাওয়া গেল ক’দিন আগে। মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে অতীতের একটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি না করলে লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ২০০৯ সালে প্রথমে ‘এভারশাইন অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ’ নামে, পরবর্তীতে একই সালে ‘এভারশাইন (ইশা) বহুমুখী সমবায় সমিতি লি.’ নামে (বাংলাদেশে নিবন্ধনকৃত) সিঙ্গাপুরে যাত্রা শুরু করে। অতি মুনাফার লোভ দেখিয়ে শত শত সহজ সরল প্রবাসী শ্রমিকদের নিকট থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিল তৎকালীন এভারশাইন সমবায় সমিতি কোম্পানির মালিক ও তার আত্মীয় পরিজনেরা (যারা একই কোম্পানিতে বিভিন্ন পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল)। যদিও এভারশাইন (ইশা) বহুমুখী সমবায় সমিতি’র কাগজে কলমে সদস্যদের মূলধন বিভিন্ন প্রজেক্ট যেমন, এভারশাইন ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, হাউজিং ডেভেলপমেন্ট, ইলেকট্রনিক্স মার্কেটিং, ট্রান্সপোর্টেশন, ট্যুরিজম, এডুকেশন, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, গার্মেন্টস, ডেইরি, ফিস এন্ড পোল্টি্র, শপিং মল, এক্সপোর্ট ইম্পোার্ট (ট্রেডিং), স্বাস্থ্যসেবা (হাসপাতাল), পার্ক ডেভেলপমেন্ট, ড্রাই ফুড, ট্রি প্লান্টেশন, ভেজিটেবল ফার্ম, মানি এক্সচেঞ্জ, নিউজপেপার, মিনারেল ওয়াটার, ইশা ল্যান্ড জোন, সফটওয়্যার, স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রভৃতি বিনিয়োগ করার কথা জানিয়েছিল। সমিতির ভুক্তভোগী সদস্যরা এক পর্যায়ে জানতে পারেন, কর্মকর্তাদের শালা—দুলাভাই, ভায়রা ভাই, মামা—খালু, মামাতো, ফুফাতো, জেঠাতো ভাই মোটকথা সব আত্মীয়—স্বজনেরা মিলে একটি প্যানেল (সিণ্ডিকেট) হয়ে গেছে। তারা নাকি সমিতির তথা সব সম্পত্তির মালিক। ঘটনার সত্যতা যাচাই করার জন্য সমিতির প্রবাসী সদস্যদের কয়েকজন ঢাকায় যেয়ে দেখতে পান ইত্তেফাক ভবনে বিশাল ব্যয়বহুল অফিসে (অফিসের ভাড়া ১ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা) পুরো গ্লাসের কয়েকধাপ পেরিয়ে, দারোয়ান, পিয়ন, আর্দালি বেষ্টিত দামী চেয়ার অলংকৃত করে রেখেছেন তাদেরই আরেকজন প্রবাসী শ্রমিক ভাই যিনি সিঙ্গাপুরে তাদের সাথেই কাজ করতেন। তিনি এভারশাইন সমিতির অন্যতম উদ্যোক্তা জাকির হোসেন খোকন। সমিতির চেয়ারম্যান এর আস্থাভাজন হয়ে চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশে এভারশাইন প্রপার্টিজ এন্ড ডেভেলপমেন্ট লি.(ইপিডিএল) এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২০১৬ সালে জানানো হয়, শ্যামলীতে ৭ কাঠার প্লট কেনা হয়েছে, ৮ তলা বিল্ডিং বানানো হবে। প্রজেক্ট ব্যয় ধরা হলো ১ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা। কিছুদিন পরে শোনা যায়, প্রজেক্টের কাজ টাকার অভাবে আটকে আছে। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পুনরায় এক চিঠিতে জানানো হয়, কোম্পানির অবস্থা ভালো নয়। প্লট গ্রাহক, সমিতির সদস্য এবং বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দেয়ার চাপ থাকায় বেশ কিছু জমি বিক্রি করে তাদের টাকা রিফান্ড দেয়া হয়েছে, ফলে প্রজেক্টের কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কোম্পানির চেয়ারম্যান আল আমিন ইকবাল এর নিকট থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে কিছু কিছু কাজ করা হয়েছে। অফিসের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন বাকি আছে। আমার জানা মতে, সদস্যরা সবাই তার কাছে ঘুরছেন তখন বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে। তিনি শুধু জমি দেখিয়ে, আশ্বাস দিয়েই সমিতির প্রবাসী সদস্যদের সান্ত¦না দিয়ে যাচ্ছেন। ভুক্তভোগীরা জানতে পারেন সুপরিকল্পিত এই প্রতারণার জাল বিস্তারের অন্যতম হোতা সিঙ্গাপুরের মাইগ্র্যান্ট কবি ও অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে পরিচিত জাকির হোসেন খোকন। কোম্পানির চেয়ারম্যান আল আমীন ইকবালও সে সময়ে বলেছিলেন, ‘সিঙ্গাপুর থেকে টাকা হ্যান্ডেল করতো ইলিয়াস, বাংলাদেশে সেই টাকা গ্রহণ করতো কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর জাকির হোসেন খোকন। সে ২০১২ সালে খরচ বাবদ সদস্যদের বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের খাতে দেখায়। সে শুধুমাত্র সমিতির প্রচারণার বিভিন্ন প্রিন্টিং বাবদই ৯০ লক্ষ টাকা খরচ করেছে। তখন আমি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের অবস্থা বিবেচনা করে তাকে এই বিষয়ে সাবধান করলে সে তার চেয়ারের ক্ষমতাবলে কোম্পানিকে করায়ত্ত ও আত্মসাৎ করার চেষ্টা করে। সেসময় আমরা তার হীন উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে অন্যান্য সকল পরিচালকদের সম্মতিতে তাকে এক পর্যায়ে বের করে দেই।’
যাই হোক এরপরে পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় অনেক জল গড়িয়েছে। আমরাও পূর্বের প্রতারণা কিছুটা ভুলতে বসেছিলাম। ঠিক সেই সময়ে আবার প্রচারণার লাইম লাইটে সেই জাকির হোসেন খোকন, তবে এবারের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। এবার তিনি নিজেই অভিযোগকারী। সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য স্ট্রেইটস টাইমস জানিয়েছে, ৪৩ বছর বয়সী জাকির হোসেন খোকন ১৯ বছর যাবত সিঙ্গাপুরে নির্মাণ খাতে কর্মরত ছিলেন। তিনি শুরু থেকেই লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন। এ বিষয়ে দুটো গ্রুপও তৈরি করেছিলেন তিনি। সম্প্রতি ফেসবুকে এক পোস্টে জাকির জানান, গত ২৪মে নিয়োগকর্তার কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তার কাজের অনুমতির মেয়াদ শেষ এবং সেটা আর নবায়ন করা যাচ্ছে না। ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন কর্তৃপক্ষ তাকে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে, সিঙ্গাপুর সরকারের একটি সংস্থায় ‘বিরূপ রেকর্ড’ থাকায় তার কাজের অনুমতি আর বাড়ানো হয়নি। তিনি বলেন, আমার কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগের পরামর্শে আমি পুলিশ ক্যান্টনমেন্ট কমপ্লেন, ইমিগ্রেশন ও চেকপয়েন্ট অথরিটির (আইসিএ) কাছে যাই। উভয় কর্তৃপক্ষই আমাকে জানায়, আমার বিরুদ্ধে তাদের কাছে খারাপ কোনো রেকর্ড নেই। প্রাক্তন জনশক্তি মন্ত্রী জোসেফাইন টিও বলেছিলেন, যদি ‘খারাপ রেকর্ড’—এর কারণে ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন করতে না দেওয়া হয়, তবে সেই কর্মীকে তার অপরাধ সম্পর্কে অবগত করা হবে এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে দুটোর একটাও ঘটেনি। জাকিরকে পরে বলা হয়েছিল, এটি একটি প্রশাসনিক ভুল এবং সে কারণে তার ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। সিঙ্গাপুরের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রশ্নের জবাবে দেশটির জনশক্তি মন্ত্রণালয় বলেছে, সিঙ্গাপুরে কাজ করার জন্য আবেদনকারীর যোগ্যতা এবং কাজের পাস বা ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন বিষয় মাথায় রাখে। জাকিরের বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রণালয় জানায়, তিনি এতটা সময় সিঙ্গাপুরে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। ওই সময়ে তিনি প্রায়ই অভিবাসী শ্রমিকদের সম্পর্কে লিখেছেন। তার কর্মকাণ্ড ও লেখালেখির পরও অনেকবার ওয়ার্কপাস নবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু, যখন কোনো পাবলিক পোস্ট বিভ্রান্তি, মিথ্যা অথবা উস্কানিমূলক তথ্য ছড়ায়, আমরা সেগুলো আলাদাভাবে দেখি। ২০২১ সালের অক্টোবরে মন্ত্রণালয়ের এক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে একটি ডরমিটরিতে প্রবাসী কর্মীরা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল। ওই ঘটনায় দাঙ্গা পুলিশ পর্যন্ত ডাকতে হয়েছিল, যা নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিল জাকির। কর্তৃপক্ষ বলছে, সিঙ্গাপুরে একজন বিদেশির কাজ করার সামর্থ্য তার অধিকার নয়। জাকিরকে দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাপুরে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যদিও তিনি দীর্ঘদিন ধরে অ্যাক্টিভিজম করেছেন। তার ওয়ার্ক পাসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সিঙ্গাপুরে তার আর চাকরি না থাকায় এখানে থাকার মেয়াদ তিনি বাড়াতে পারবেন না। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য “His work pass has since expired. He cannot prolong his stay when he no longer has a job in Singapore. He has overstayed his welcome. ‘জাকির সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তা হলো, প্রথমে কাজ নিয়ে সিঙ্গাপুর আগমন, বাংলার কণ্ঠ পত্রিকার হাত ধরে কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পাওয়ার পর খ্যাতিমান হওয়ার স্বপ্নে বিভোর জাকির স্থানীয় কিছু কবি, সাহিত্যিকের ঢোলে পরিণত হয়। একপর্যায়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে এভারশাইন গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হয়ে হাতিয়ে নেয় প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো লক্ষ লক্ষ টাকা। পরবর্তীতে এভারশাইন প্রপার্টিজ এন্ড ডেভেলপমেন্ট লি.(ইপিডিএল) থেকে বিতাড়িত হয়ে আবারও সিঙ্গাপুরে কাজ নিয়ে এসে সুবিধা করতে না পেরে হাতিয়ার করে লেখালেখিকে। সিঙ্গাপুরে কাজ করার পাশাপাশি বাংলার কণ্ঠ’র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে সুযোগসন্ধানী জাকির ভদ্র ও নম্রতার মুখোশ পরে বাংলার কন্ঠে আসা স্থানীয় সংস্কৃতি কর্মীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে, ফেসবুকে হোমড়াচোমড়াদের সাথে ছবি ছাপিয়ে ‘মুই কি হনুরে’ হিসেবে আবিভুর্ত হয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে। একসময়ে তাদের মুখপত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে নিজেকে অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে প্রচার করা শুরু করে। এক জীবনের তো লিমিট আছে। যে যা করবে তার ফল এই জীবনে তো কিছুটা ভোগ করতে হবে। গুটিকয়েকজন প্রবাসী জাকির হোসেনের এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেননি। ফেসবুকে সমবেদনা প্রকাশ করেছে কেউ কেউ। তাদেরকে বলছি মানুষ যে পাত্রে খায় সেই পাত্রই যদি ফুটো করে, তার জন্য অত মরা কান্না কেন বাপু? এসব দেখে নিজেরা শোধরান। সিঙ্গাপুরে আসা হয়েছে কাজ করতে, এখানকার হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিতে নয়। আবার এও দেখা গেছে, জাকির হোসেনের প্রত্যাবাসন বিষয়ে স্থানীয়দের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একাধিক পেজে নানান বিদ্রুপাত্মক ও মুখরোচক সমালোচনার ঝড়! জাকিরের ‘বিভ্রান্তিকর’ ও ‘উস্কানিমূলক’ পোস্টকে কেন্দ্র করে তাকে দেশে প্রত্যার্পণের আগে কারাগারে প্রেরণ করা হলো না কেন এমন প্রশ্নও তুলেছেন নেটিজেনদের অনেকে।  অনেকের মন্তব্যে তাকে সিঙ্গাপুরের জন্য বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করে তার প্রত্যাবাসনকে স্বাগত জানানো হয়েছে। যা দেখে আমাদের ক্রমবিকাশমান শ্রমবাজার নিয়েও শংকিত হতে হয় বৈকি? এক জাকিরের উচ্চাকাঙ্খার বলি কী দিতে হবে সকল শ্রমজীবী প্রবাসীদের?
কয়েক বছর আগে বাংলার কণ্ঠ’র হাত ধরে খ্যাতিপ্রাপ্ত আরেক বাংলাদেশি কর্মীকে কবি এবং নির্মাণ কর্মীর দ্বৈত জীবনের সংঘাতে হারাতে হয়েছে কর্ম ও দিতে হয়েছে চরম মূল্য। স্থানীয় প্রকাশনা থেকে তার কবিতার বই প্রকাশ ও মাইগ্র্যান্ট কবি খ্যাতি পাওয়ার পর সাধারণ একজন প্রবাসী কর্মী হিসেবে জীবন যাপন করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে। পরে ধর্না ধরতে হয়েছে দেশি—বিদেশি বন্ধুদের। আবারও কষ্টেসৃষ্টে ধার—দেনা করে সিঙ্গাপুরে এসেছেন, বর্তমানে সুবোধ একজন প্রবাসী কর্মী হয়ে স্থানীয় একটি নির্মাণ কোম্পানিতে কাজ করছেন। আশার কথা তিনি ভুল বুঝতে পেরে খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে মাটির পৃথিবীতে পা রেখেছেন, এখন জীবন জীবিকার প্রয়োজনে নিজেকে আরও অনেক বেশি দক্ষ করে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। আরও বেশ কয়েকজন মাইগ্র্যান্ট কবির ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে, তাদের নাম আর উল্লেখ করা হলো না।

বাংলার কণ্ঠ পত্রিকাটি সেই ২০০৬ সালে প্রকাশনার শুরু থেকেই শ্রমজীবী প্রবাসীদের জন্য নিরলসভাবে নানামুখী কাজ করে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি কর্মীরা যাতে সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারে, অবৈধ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে, নিজেদেরকে ছুটির দিনের অবসরে সৃজনশীলতায় ব্যস্ত রাখতে পারে এসব বিবেচনায় বাংলার কণ্ঠ রাইটার্স ফোরাম, কালচারাল ফাউন্ডেশন, সাহিত্য পরিষদ, শ্রমজীবী অভিবাসীদের অবসর বিনোদন ও সংস্কৃতিচচ্চর্া কেন্দ্র ‘দিবাশ্রম’ ইত্যাদি বিভিন্ন নামের প্রায় সতেরটি কমিটি গঠন করা হয়, যা শ্রমজীবী কবি লেখকেরাই বিভিন্ন সময়ে গড়ে তুলেছিল। বাংলার কণ্ঠ তার গৌরবোজ্জ্বল ষোল বছরের অজ¯্র কার্যক্রমের সুবাদে অর্ধ শিক্ষিত, মধ্যম শিক্ষিত অভিবাসী শ্রমজীবিরা কবিতা লিখে, গান লিখে, গান গায়, নাটক লিখে, অভিনয় করে, প্রবাস জীবনের কষ্টের করুণ গাঁথার ডকুমেন্টরী তৈরি করে, সাংবাদিকতা করে, আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে পদক ও সম্মান কুড়ায়! একথা বললে অতিশয়োক্তি হবে না যে, আজ যারা সিঙ্গাপুরে শ্রমজীবী প্রবাসীদের নামে ফেসবুক ভিত্তিক বায়বীয় বিভিন্ন সংগঠন, পেজ খোলে কিম্বা সংবাদ মাধ্যমের নামে অনিবন্ধিত অবৈধ মিডিয়া খোলে নানাবিধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন তাদের অনেকেরই উৎপত্তিও বাংলার কণ্ঠ’র হাত ধরেই, তাদের অনুপ্রেরণার উৎসস্থলও বাংলার কণ্ঠ, যা বাংলাদেশি কমিউনিটির সকলেরই জানা। তারা যতই ব্যক্তিগতভাবে স্থানীয় বিভিন্ন স্টুডেন্ট গ্রুপ বা অর্গানাইজেশনের সাথে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তাও বাংলার কণ্ঠ’র সুবাদেই, তারা বিষয়টি জনসন্মুখে অস্বীকার করলেও নিজেদের কাছে জবাবদিহি করতে গিয়ে তাদের জীবনে বাংলার কণ্ঠ’র অবদানকে অস্বীকার করতে পারবেন না একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এদের মধ্যে আমাদের প্রতিবেশি দেশেরও দুই একজন রয়েছে যারা বাংলার কণ্ঠ’র হাত ধরে, সহযোগিতার নামে বাংলার কণ্ঠ’র বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেদের লাইম লাইটে নিয়ে এসে প্রোফাইল উন্নীত করে স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ‘বাংলার কণ্ঠ সাহিত্য পরিষদের’ কতিপয় উচ্চাকাঙ্খী সদস্যদের ভাগিয়ে নিয়ে, নানান নামে ভার্চুয়াল সংগঠন খুলে স্থানীয় বিদেশীদের ভুল বুঝিয়ে বাংলার কণ্ঠ’র ক্ষতি সাধন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।
বাংলার কণ্ঠ নিজস্ব উদ্যোগ ও অর্থায়নে সিঙ্গাপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অভিবাসী প্রতিভাগুলোকে একত্রিত করে তাদের নিজ নিজ প্রতিভা বিকাশের উপযুক্ত জায়গা দিয়েছে, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ করে দিয়েছে, শ্রমিক হিসেবে নয় মানুষ হিসেবে আত্মসম্মানবোধ নিয়ে পথ চলার উপলব্ধি জাগিয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছে এবং এখান থেকে পরিচিতি লাভ করে অনেকেই এখন স্বস্বীকৃত সেলিব্রেটি হয়েছে। শ্রমিক তকমা থেকে মাইগ্র্যান্ট কবি, লেখক, নাট্যকার, সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, এসবই বাংলার কণ্ঠ’র অবদান।
অভিবাসী শ্রমিকেরা সভ্যতার এক আশ্চর্য জ্বালানি। এদের সবচেয়ে কম পয়সায় খাটানো যায়। এদের জীবন—নিরাপত্তা- জীবিকার আইনি নিশ্চয়তা থাকে সবচেয়ে কম, কারণে কিংবা অকারণে যে কোনো বদনাম এদের গায়ে সেঁটে দিয়ে যে কোনো মুহূর্তে পালে পালে আটকে রাখার সুযোগ আছে বন্দিশিবিরে কিংবা কারাগারে। চাইলে বের করেও দিতে পারবে গ্রহীতা দেশ থেকে। উন্নত দেশগুলোতে শ্রমিকের অধিকার হরণ করা হচ্ছে কি না সেগুলো হিসেব—নিকেশের জন্য রয়েছেন নানা হিতৈষী ব্যক্তিবর্গ ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। তারা শ্রমিকের অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে কাগজে কলমে, বলনে সোচ্চার হন, তবে অনেক ক্ষেত্রে তা’ নিজেদের ফায়দা লাভেরই উদ্দেশ্যে! অভিবাসী শ্রমিকের পাশে দাঁড়ানো মানে সোশ্যাল স্ট্যাটাস, নিজেদের প্রোফাইল উন্নীতকরণ ও দেশি—বিদেশি তহবিল থেকে মোটা অঙ্কের ডোনেশন। আর বিপদগ্রস্ত শ্রমিকের মধ্যে যদি সুপ্ত মেধা থাকে এবং সেটা যদি প্রকাশমান হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। তার এই মেধাকে পুঁজি করে শুরু হয় আরেক বাণিজ্য। প্রবাসে সুখের ষোলকলা পূর্ণ করতে হিতৈষী আর শুভাকাঙ্খীদের গ্যাড়াকলে পড়ে অধিকার, ন্যায়বিচার এসব গালভরা বুুলির সুফল পেতে যেয়ে আশ্রয়প্রার্থীর ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। সে না পারে গিলতে না পারে উগড়াতে। আর যখন শ্রমিক তার আসল অবস্থান বুঝতে পারে ততক্ষণে সুবিধাভোগীরা তাকে ছিবড়ে শেষ রসটুকু নিংড়ে নেয়। অধিকাংশ দেশগুলোতেই দরিদ্র দেশের অভিবাসী শ্রমিকের বর্তমান বাস্তবতা এটাই। একজন অভিবাসী শ্রমিকের শক্তি ও দুর্বলতা হলো তার দারিদ্র্যতা, কর্মক্ষমতা ও মেধা। আর এই ত্রিমাত্রিকতাই অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হচ্ছে কোনো না কোনো মুখোশধারী হিতৈষীর।
তাই প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি ভাইদের বলছি দারিদ্র্যতা ও উপরি খ্যাতির যাঁতাকলে নিজেদের বিলিয়ে দিয়ে সামান্য বাড়তি আয়ের বশবর্তী হয়ে নিজের ও দেশের সম্মান ক্ষুণ্ণ করার পাশাপাশি জীবিকার আশ্রয়স্থলটুকু হারাবেন না, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। অভিবাসী শ্রমিকের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে যারা নিজেদের পরিপূর্ণ করছেন তাদের প্রতি অনুরোধ মানবতাকে এভাবে ভুলুণ্ঠিত করবেন না।

আরও বিস্তারিত জানতে এই লিংকে ক্লিক করুন:

https://www.mom.gov.sg/newsroom/press-replies/2022/0622-in-response-to-media-queries-mom-statement-on-non-renewal

https://www.straitstimes.com/singapore/migrant-worker-advocate-who-did-not-get-work-pass-renewed-made-misleading-false-public-posts-mom?utm_campaign=stfb&utm_medium=social&utm_source=facebook&fbclid=IwAR384FDQ3herCuiX29aDlt6OgYdbef09oHQS4VVAlvPCTbYrSAkNlXLd5DY&fs=e&s=cl

Facebook Comments Box

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১