শুক্রবার, ১৩ই মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

সব

Singapore
Corona Update

Confirmed Recovered Death
59,879 59,746 29

Bangladesh
Corona Update

Confirmed Recovered Death
543,717 492,059 8,356

বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শনে শিক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষিত

ড. মইনুল ইসলাম | ২৪ মার্চ ২০২২ | ১০:২৬ অপরাহ্ণ
বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শনে শিক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষিত

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরুর লগ্নে বাংলাদেশ ছিল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ। সাড়ে সাত কোটি জনগণের এক কোটি তখন ফিরে আসছিল ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো থেকে। তাদের ঘরবাড়ি ছিল বিধ্বস্ত, লুণ্ঠিত কিংবা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনীর অগ্নিসন্ত্রাসে পুড়ে ছারখার হওয়া ধ্বংসস্তূপ। দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে প্রাণ বাঁচানো আরো দুই-আড়াই কোটি মানুষও তাদের ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণে এবং সংসার গুছিয়ে তোলার সংগ্রামে ছিল জেরবার। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ৩০ লাখ মানুষের পরিবারের যারা বেঁচেছিলেন তারাও ছিলেন অর্থনৈতিকভাবে সর্বস্বান্ত এবং শোকে পাগলপ্রায়। দেশের খাদ্য পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ, ১৯৭০ সালেই তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্যঘাটতি প্রায় ৪০ লাখ টনে পৌঁছে গিয়েছিল। রাস্তাঘাট, সড়ক-মহাসড়ক, সেতু-কালভার্ট, বন্দর ও রেলপথগুলো ছিল ধ্বংসযজ্ঞের শিকার। এই ভয়াবহ সংকট মোকাবেলায় সরকারের কোষাগার ছিল শূন্য, বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ছিল পাকিস্তানিদের সুপরিকল্পিত লুণ্ঠনের ফলে একদম খালি। দেশের প্রাইভেট সেক্টরের কলকারখানাগুলোর ৮৯ শতাংশের মালিক ছিল হয় পাকিস্তানি নয়তো অবাঙালি। তারা পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের আগেই। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল—এই ২৪ বছরের পুরো সময়টা পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হিসেবে শোষণ, লুণ্ঠন ও অবিশ্বাস্য রকম বঞ্চনার শিকার হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান। মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আক্ষরিকভাবেই ‘পোড়ামাটি’ নীতি অবলম্বন করেছিল (‘বেলুচিস্তান ও বাংলার কসাই’ সমরনায়ক টিক্কা খানের ঘোষণা ছিল—‘মুঝে সি ফ মিট্টি চাহিয়ে’)।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার আগেই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন সরকার সংকট মোকাবেলার কঠিন সংগ্রামে জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামিয়ে দিয়েছিল। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণের পর সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভা গঠন করে বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনের দায়িত্বটি কাঁধে তুলে নেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ঘোষিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তিনটি রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করেছিল—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধু এগুলোর সঙ্গে যোগ করলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এ চারটি রাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে দেশের সংবিধান রচিত হলো। বঙ্গবন্ধু দেশের শ্রেষ্ঠ চারজন অর্থনীতিবিদকে রাজি করালেন পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ও সদস্য হওয়ার জন্য। প্রফেসর নুরুল ইসলাম হলেন মন্ত্রীর পদমর্যাদায় ডেপুটি চেয়ারম্যান, আর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় সদস্য হলেন প্রফেসর মোশাররফ হোসেন, প্রফেসর রেহমান সোবহান ও প্রফেসর আনিসুর রহমান। কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন প্রফেসর এআর খান, প্রফেসর মুজাফফর আহমদ, ড. স্বদেশ রঞ্জন বোস ও প্রফেসর শামসুল ইসলামের মতো মেধাবী ব্যক্তিরা। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন এবং পরিকল্পনা কমিশনের নেতৃত্বে শুরু হলো ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সরকারি বাজেট এবং প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের অব্যবহিত পর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির প্রথম স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ উদযাপনকে উপলক্ষ করে বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত বেতার ভাষণে বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিস্তারিত নীতিমালা ঘোষণা করলেন।

বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রথম বাজেট ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে এ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২১ দশমিক ১৬ শতাংশ সরকারি ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছিল। তখনকার যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির বাস্তবতায় শিক্ষা খাতে এত বেশি ব্যয় বরাদ্দ যে সরকারের জন্য কত বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তা এখন চিন্তাও করা যাবে না। এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে জনগণকে দ্রুত শিক্ষিত করে গড়ে তোলাই যে উন্নয়নের মূল দর্শন হতে হবে সে বিষয়টি বঙ্গবন্ধু এবং তার সরকারের নীতিনির্ধারকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের শেষ বাজেট ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেটেও শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার প্রদানের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। দুঃখজনক হলো, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ক্ষমতাসীন সমরপ্রভু জিয়াউর রহমান ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতের সরকারি ব্যয় বরাদ্দকে টেনে ১১ শতাংশের নিচে নামিয়ে এনেছিলেন। তখন থেকে পুরো জিয়া আমল ও এরশাদ আমলে প্রতিরক্ষা খাতের সরকারি ব্যয় বরাদ্দ সরকারের প্রধান অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছিল। ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় বরাদ্দ ছিল বাজেটের মাত্র ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০০১-০৬ মেয়াদের বিএনপি-জামায়াত কোয়ালিশন সরকারের সময় কয়েক বছর শিক্ষা খাতের সরকারি ব্যয়কে জিডিপির ২ শতাংশেরও নিচে নামিয়ে ফেলা হয়েছিল। অনেকেই হয়তো জানেন না যে ওই সময়ে শিক্ষা খাতের সরকারি ব্যয় জিডিপির অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে ছিল সর্বনিম্ন। আরো দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, চলমান ২০২১-২২ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় বরাদ্দ জিডিপির ২ দশমিক ৩ শতাংশেই আটকে রয়েছে। ১৩ বছর ধরে এ অনুপাত জিডিপির ২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ ইউনেস্কো বলছে জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা উচিত, বাংলাদেশও ওই অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষরকারী দেশ।

১৯৭২ সালের সংবিধানে শিক্ষা সম্পর্কে অঙ্গীকার বিধৃত হয়েছে ১৭ নম্বর ধারায়, যা নিম্নরূপ : রাষ্ট্র (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য, (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সংগতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য, (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।

উল্লিখিত অঙ্গীকার মোতাবেক দেশের প্রাথমিক পর্যায়ের মাদ্রাসা শিক্ষা ও ইংরেজি মিডিয়াম শিক্ষাকে ধাপে ধাপে মূলধারার ‘একক মানসম্পন্ন’ কারিকুলামে নিয়ে আসাই সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালেই পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক ঘোষণা করার পাশাপাশি দেশের সব প্রাথমিক স্কুলকে জাতীয়করণ করেছিল। ১৯৭৪ সালে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের যে প্রতিবেদনটি সরকার গ্রহণ করেছিল, তাতে ওই বাধ্যতামূলক, অবৈতনিক ও একক মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব ছিল। জাতির দুর্ভাগ্য, কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের রিপোর্ট সরকার গ্রহণ করেছে মর্মে সরকারি গেজেট প্রকাশিত হওয়ার আগেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছিলেন। ওই রিপোর্টের সুপারিশগুলো ১৯৭৫-৯৬—এই ২১ বছরে কোনো সরকারেরই সুবিবেচনা পায়নি। এমনকি ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের সরকার কর্তৃক গঠিত ‘শামসুল হক কমিটির’ রিপোর্টেও বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালে প্রফেসর কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে এ সাংবিধানিক অঙ্গীকারটিকে বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং বর্তমানে তা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

এ দেশে ১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষা চালু রয়েছে। তালিকাটা দেখুন: ১) সরকারি প্রাইমারি স্কুল, ২) এক্সপেরিমেন্টাল প্রাইমারি স্কুল, ৩) রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল, ৪) নন-রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল, ৫) প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট-সংযুক্ত প্রাইমারি স্কুল, ৬) কমিউনিটি স্কুল, ৭) স্যাটেলাইট স্কুল, ৮) হাই স্কুলের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাইমারি স্কুল, ৯) এনজিও পরিচালিত স্কুল, ১০) কিন্ডারগার্টেন ও ১১) ইবতেদায়ি মাদ্রাসা। শিক্ষাজীবনের শুরুতেই শিশুকে এত ধরনের বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার জালে আটকে ফেলার এমন নৈরাজ্যকর ব্যবস্থা বিশ্বের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। মা-বাবার বিত্তের নিক্তিতে ওজন করে নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে কে কিন্ডারগার্টেনে যাবে, কে সরকারি বা বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলে সুযোগ পাবে, কার এনজিও স্কুলে ঠাঁই হবে, আর কাকে ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় পাঠিয়ে মা-বাবা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন যে ‘লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে’ ভাতটা তো অন্তত জুটল! এভাবে সারা জীবনের জন্য ওই শিশুকে বৈষম্যের অসহায় শিকারে পরিণত করে ফেলা তার মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বড় হয়ে সে মা-বাবাকে অভিশাপ দেবে কিংবা পরিবারের দারিদ্র্যকে দোষ দেবে তাকে ভুল স্কুলে বা মাদ্রাসায় পাঠানোর জন্য, কিন্তু তখন আর ভুল সংশোধনের কোনো উপায় থাকবে না। এর অন্য পিঠে দেশে ইংরেজি মাধ্যম কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা বৃদ্ধিকেও নাটকীয় বলা চলে। মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মা-বাবারা তাদের সন্তানদের জন্য এখন আর বাংলা মাধ্যম প্রাইমারি স্কুলগুলোকে উপযুক্ত মানসম্পন্ন মনে করছেন না, কিন্ডারগার্টেনে পড়ানোটাই নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে গত সাড়ে চার দশকে। ১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষা চালু থাকতে দেয়া কি অসাংবিধানিক নয়?

শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো যুগোপযোগিতাহীন কারিকুলাম অনুসরণকারী হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসার নাটকীয় বিস্তার। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও এরশাদ মাদ্রাসাশিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ায় গত ৪৭ বছরে এ দেশে হাজার হাজার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেলসম্পদের খুদ-কুঁড়া হিসেবে মাদ্রাসাগুলোয় যে বিদেশী খয়রাত প্রবাহিত হচ্ছে, ওই খয়রাতের বড় অংশটাই কওমি মাদ্রাসাগুলো আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়েছে। মাদ্রাসাগুলোয় যেহেতু একই সঙ্গে আবাসিক সুবিধা ও আহারের ব্যবস্থা থাকে, তাই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য এগুলোর আকর্ষণ ক্রমবর্ধমান। মাধ্যমিক শিক্ষায়ও চারটি ধারার সমান্তরাল অবস্থান—ইংরেজি মাধ্যমের নানান কিসিমের মহার্ঘ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মূলধারার বাংলা মাধ্যম সরকারি স্কুল, বাংলা মাধ্যম বেসরকারি স্কুল এবং কয়েক ধরনের মাদ্রাসা। আমরা এখন ভুলে গেছি যে বঙ্গবন্ধুর আমলে একটিও নতুন ক্যাডেট কলেজ স্থাপিত হয়নি। বরং কুদরাত-এ-খুদা কমিশন ধাপে ধাপে ক্যাডেট কলেজগুলোকে মূলধারার মাধ্যমিক শিক্ষার সঙ্গে একীভূত করার সুপারিশ করেছিল, অথচ এখন উল্টো সারা দেশে ও লেভেল/এ লেভেল চালু হচ্ছে যত্রতত্র। এই বিভাজিত ও বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা এক দেশের মধ্যে চারটি পৃথক জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করে চলেছি!

বঙ্গবন্ধু দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে। এটা মোটেও কাকতালীয় নয় যে ওই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পর গত ৪৭ বছরে এ দেশের আর কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়নি। ১৯৯২ সালে বিএনপি সরকার দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন চালু করার পর প্রাইভেট সেক্টরে উচ্চশিক্ষা এখন মহার্ঘ পণ্যে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মুনাফাবাজির লোভনীয় ক্ষেত্র এখন শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষার এমন বাজারীকরণ কি অসাংবিধানিক নয়?

লেখক: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
https://bonikbarta.net/home/news_description/294353/

Facebook Comments Box

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১