শনিবার, ২৭শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সব

Singapore
Corona Update

Confirmed Recovered Death
59,879 59,746 29

Bangladesh
Corona Update

Confirmed Recovered Death
543,717 492,059 8,356

যেই ফুলের খুশবুতে মাতোয়ারা ভুবন

যেই ফুলের খুশবুতে মাতোয়ারা ভুবন

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন | ২০ অক্টোবর ২০২১ | ১২:৪৯ অপরাহ্ণ
যেই ফুলের খুশবুতে মাতোয়ারা ভুবন

 

কবির ভাষায়, ১২ রবিউল আউয়ালে বিশ্বনবীর আগমন, যেই নবীজির শুভাগমনে ধন্য হলো ত্রিভুবন। সারা জাহান মাতোয়ারা যে ফুলের খুশবুতে, তিনিই হলেন প্রিয় রাসুল সৃষ্টি-সুখের উল্লাস তাতে! কুল কায়েনাত তথা গোটা সৃষ্টি-জগতের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ প্রেরিত মহাপুরুষ, বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত মানবতার অকৃত্রিম কাণ্ডারি, মানবৈতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)।
কবি বলেছেন, জুটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি, দুটি যদি জুটে তবে অর্ধেকে ফুল কিনে নিও হে অনুরাগী! ফুলের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য এমনই। বাগানের ফুল একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে তার সুবাস ছড়ায়, মানুষ তার সুগন্ধি নেয়, পুলক অনুভব করে। কিন্তু এ ফুলের সৌরভ খুবই ক্ষণস্থায়ী, ফুল ছিঁড়ে নিলে তা কিছু সময় পরেই বিবর্ণ হতে থাকে, সুগন্ধিও তিরোহিত হয়ে যায়। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে বিশ্ববাগে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক ফুলের সংযোজন ঘটেছিল, যার সৌরভ আজও সর্বত্র সমানভাবে প্রবহমান।
মহান প্রভু বলেন, ‘কুল ইয়া আইয়ুহান্নাস ইন্নি রাসুলুল্লাহি ইলাইকুম জামিআ’, অর্থাৎ হে রাসুল! আপনি বলে দিন- ওহে মানব সকল! আমি তোমাদের সকলের জন্য রাসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। সে কারণেই সেই ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্বময়। যে বা যারাই নিজেদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও দেশের নানা অঙ্গনে জড়িয়ে থাকা দুর্গন্ধময়তার অবসান ঘটাতে চায়, তাদের জন্যই মুহাম্মদি ফুলের সৌরভ; এ সৌরভের অতুলনীয় ঘ্রাণেই যে কেউ তার পরিমণ্ডলকে সাজাতে ও বিন্যস্ত করতে পারে নতুন আঙ্গিকে, নবচেতনায়।
হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। রবিউল আউয়াল মানে হলো প্রথম বসন্ত। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যেমন সজীবতা লাভ করে, তেমনি এ মাসে মানবকুল শিরোমণি মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে জরাগ্রস্ত পৃথিবী তার প্রাণ ফিরে পায়; তারই স্বর্গীয় খুশবুতে বিশ্ব-প্রকৃতি নির্মলতা ও সজীবতার উপাদান লাভ করে। মহানবীর (সা.) ঘোষণা অনুযায়ী এ মাসের প্রথম দিন যদি কেউ রোজা পালন করে, তবে মহান আল্লাহ তাকে পূর্ণ বছর রোজা রাখার সমান সওয়াব দান করবেন। কেননা এটি সেই মাস, যা বিশ্ব-ইতিহাসের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের স্মারক বহন করে চলেছে; মানবতার মহান সুহৃদ রাসুলে পাক (সা.) এ মাসেই ধরাপৃষ্ঠে যেমন আগমন করেন, এ মাসেই হিজরতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সূত্রপাত হয় এবং পৃথিবীর সর্বনিকৃষ্ট যুগকে সর্বশ্রেষ্ঠ যুগের রূপায়ণ ঘটিয়ে এ মাসেই প্রিয় নবীজি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেন।
মানবৈতিহাসের সর্বনিকৃষ্ট যুগ ছিল আরবের আইয়ামে জাহেলিয়া। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে তৎকালীন আরবসমাজ সভ্যতা ও মানবিকতার সকল মানদণ্ডে ছিল এক বর্বর আর পাশবিকতার মিশেলে অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থার নির্মম প্রতিচ্ছবি। মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা, ভালোবাসা ও সংবেদনশীলতা ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। একে অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিপরীতে নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার নির্দয় প্রকাশ ঘটানোই ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনার কারণে বছরের পর বছর এক গোত্রের সঙ্গে অন্য গোত্রের বিবাদ-বিসম্বাদ লেগেই থাকত। সামান্য কারণে সৃষ্টি হওয়া ফ্যাসাদের ঘটনা রূপ নিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম খুনের নেশায় মেতে উঠত অজ্ঞতার আঁধারে ডুবে থাকা সেই জনগোষ্ঠী। ‘জোর যার মুল্লুক তার’- সর্বত্র এই নীতিরই প্রতিফলন ঘটত। হেন অপরাধ নেই, যা তখন সমাজে সংঘটিত হতো না। অনাচার-ব্যাভিচার, নেশাগ্রস্ততা, জুয়া-মদ্যপান, কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া, দাসপ্রথা, গোত্রতান্ত্রিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, নির্লজ্জতা, অশ্নীল সাহিত্য, নারীর অসম্মান, অনৈতিকতাসহ যাবতীয় কুসংস্কার পুরোদস্তুর বিদ্যমান ছিল। যেন পৃথিবী আর পাপের ভার সইতে পারছিল না। যেন সর্বত্রই এক ঘোর অন্ধকারের অমানিশা নেমে এসেছিল। তাই সেই ভয়াল আঁধারকে দূরীভূত করার মহান লক্ষ্যে প্রকৃত অর্থেই একটি অনন্যসাধারণ ‘নূর’ তথা আলোকের আবির্ভাব অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছিল। মানবতার বাস্তব তাগিদেই সেই নূরের বিচ্ছুরণ-বিকিরণ ঘটেছিল। মহান আল্লাহ তাই ঘোষণা করেন- ‘কাদ জাআকুম মিনাল্লাহে নূর’, অর্থাৎ বিশ্বমানবতার জন্য আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এক নূর। সেই নূর মানে হলো আলো আর আলো বলতে এটি সূর্যের আলো নয়, চন্দ্রেরও আলো নয়; বরং এই নূর হলেন ‘নূরে মুহাম্মদি’ তথা বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)। প্রিয় নবীর (সা.) কণ্ঠেও সেটি প্রতিধ্বনিত হয়েছে- ‘আওয়ালু মা খালাকাল্লাহু নূরি’, অর্থাৎ মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নূর তৈরি করেছেন। পারস্যের কবি আত্তারের প্রতিভায় সেটি এভাবে চিত্রিত হয়েছে- ‘সাইয়েদুল কাউনাইন ওয়া খাতামুল মুরসালিন, আখের অমাদ বুদ ফাখরুল আওয়ালিন’, অর্থাৎ তিনি হলেন উভয় জাহানের (ইহজগৎ ও পরজগৎ) নেতা এবং সর্বশেষ রাসুল, তার আগমন ঘটেছে সবশেষে; কিন্তু তিনিই ছিলেন সৃষ্টির প্রথম গৌরব, প্রথম সৌরভ; যার খুশবুতে মাতোয়ারা ভুবন।
আল কোরআনুল কারিমের সুরা রহমানে মহান আল্লাহ সুগন্ধি ফুলের কথা উল্লেখ করেছেন। মুসলিম শরিফের হাদিসে রয়েছে, রাসুলে পাক (সা.) ফুলের তাৎপর্য ঘোষণা করতে গিয়ে বলেন, ‘কাউকে যদি ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা বা সম্মাননা জানানো হয়, তবে সে যেন তা প্রত্যাখ্যান না করে; কেননা ফুল বহনে হালকা এবং তার ঘ্রাণ খুবই উত্তম।’ তবে নিঃসন্দেহে আমাদের কাছে বৃক্ষ-তরুর সুগন্ধি ফুলের চাইতে জীবনাদর্শের অনুসরণীয় প্রিয় রাসুল নামের স্বর্গীয় খুশবুমাখা ফুলের আবেদনই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ; যে ফুলকে ভালোবাসলে মহান স্রষ্টার ভালোবাসা অর্জিত হয়, জীবনের সকল পাপাচারের অবসান ঘটে এবং প্রত্যাশিত মুক্তি ও নাজাতের পথ প্রসারিত হয়। রবিউল আউয়ালের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার, মানবতা ও সভ্যতার মুক্তি ও সর্বাঙ্গীণ সফলতার জন্য মহান প্রভুর পক্ষ থেকে আবির্ভূত যেই ফুলের খুশবুতে ভুবন আজ মাতোয়ারা, আমরা তারই অনুপম আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকেও সেই খুশবুর প্রবহমান ধারায় ধন্য করব।
লেখক: চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

Facebook Comments Box

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০