শনিবার, ২৭শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সব

Singapore
Corona Update

Confirmed Recovered Death
59,879 59,746 29

Bangladesh
Corona Update

Confirmed Recovered Death
543,717 492,059 8,356

অসাম্প্রদায়িকতা মুখের কথা নয়

মোজাম্মেল হোসেন | ২০ অক্টোবর ২০২১ | ১২:৪৭ অপরাহ্ণ
অসাম্প্রদায়িকতা মুখের কথা নয়

 

পঞ্চম দিনেও যখন উপর্যুপরি হাঙ্গামা অব্যাহত, একেক দিন কয়েকটি করে জেলায় ছড়িয়ে ১৭টি জেলা আক্রান্ত, ঘটছে মৃত্যু, যখন লোকে আশঙ্কা করে এর পরে কোন জেলা, তখন পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে কি বলা যায়?

হামলা বিস্তারের যে ধরন তাতে এ ঘটনাগুলো যে ধর্ম অবমাননায় মানুষের স্বতঃস্ম্ফূর্ত আবেগে ঘটছে না, গোপনে পরিকল্পিত ও সংগঠিত তা দিবালোকের মতো পরিস্কার। এ কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারি নেতারা বলছেন। কোথাও মন্দির আক্রমণের পরে পুলিশি তৎপরতা, হতাহত, গ্রেপ্তার, ডজন ডজন মামলায় হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা আসামি, যে মামলাগুলোর বিচার আদৌ কবে শেষ হবে কেউ জানে না- এই প্রক্রিয়ার বাইরে অপরাধীদের ধরে শাস্তি দেওয়া ও সমস্যাটির অবসান ঘটানোর জোরালো কোনো রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবস্থা গ্রহণের কি প্রয়োজন নেই? না-কি সমস্যাটা সব পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচনের ভোটের হিসাব-নিকাশের জটিল অঙ্কে ঢুকে গেছে? প্রাণ দিচ্ছে, অহর্নিশি নিরাপত্তাহীনতায় জীবন বিপর্যস্ত হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এবং তাদের সহ নিজেদের চৌদ্দ পুরুষের দেশ অচেনা হয়ে যাচ্ছে বিবেকবান মুসলমানদের কাছেও?
বিবেকবান মুসলমানের সংখ্যা কত? সংখ্যা বেশি হলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা রক্ষা এবং ন্যায়বিচারের জন্য ক’জন মুসলমান সক্রিয়?
বাংলাদেশ হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, শুধু মুষ্টিমেয় কুচক্রী ও অপশক্তি এই সম্প্রীতি নষ্টের অপচেষ্টা করছে, ইসলাম শান্তির ধর্ম, অশান্তি সৃষ্টির চক্রান্ত বরদাশত করা হবে না, অপরাধী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না- এই কথাগুলো বক্তৃতায়, মিডিয়ায় যেন ভাঙা রেকর্ডের মতো সব সময় বাজছে। আত্মপ্রবঞ্চনামূলক নয় তো এই কথাগুলো? আমরা কি সত্যিই কথাগুলো বিশ্বাস করি? করলে বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষায় কতটুকু সক্রিয়ভাবে এগিয়ে যাই?
সম্প্রীতি মানে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় না। তবে কেন হিন্দুরা স্বাধীনতার পরও নীরবে দেশত্যাগ করতে করতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে অবিশ্বাস্য নেতিবাচক হয়ে পড়ল? ১৯৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিধনযজ্ঞে সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দুরাই তো বেশি মূল্য দিয়েছে, তবে?
কুমিল্লায় সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও কয়েকদিন ধরে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটার পরও রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে জোরালো প্রতিবাদের আওয়াজ উঠতে দেখা যায়নি। অতীতে পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন নস্যাৎ করতে সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দিত। তখন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সকল ধর্মের মানুষের সম্প্রীতি রক্ষার জন্য বিপন্ন হিন্দুদের পাশে মুসলমানরা অকুতোভয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরের ঘটনা কেন্দ্র করে এখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানো হলে ঢাকায় গণ্যমান্য সকল নাগরিক যৌথ বিবৃতি দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে লিফলেট ছেড়ে পথে নেমেছিলেন। ওই শিরোনামে সকল সংবাদপত্রে যৌথ সম্পাদকীয় ছাপা হয়। বিশাল মিছিল হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে সাহসী যুবকরা দাঙ্গা থামাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আরও আগে ১৯৫০ সালে পাকিস্তানি শাসকদের মদদে, পুলিশ-আনসারদের নিষ্ফ্ক্রিয়তায় ঘটে যাওয়া বীভৎস দাঙ্গাগুলোতে হিন্দুদের বাঁচাতে মুসলমানদের প্রাণ দেওয়ার ইতিহাস আছে। সে বছর বরিশালের গ্রামে আলতাফউদ্দিন মোহাম্মদ দাঙ্গাবাজদের বল্লমের আঘাতে মারা যান আর ১৯৬৪তে ঢাকা শহরে প্রাণ দেন আমির আলী চৌধুরী ও নিয়াজ আলী মাস্টার। জাতীয়ভিত্তিক ও পাড়া-মহল্লায় দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়েছে। এর ফলে পাকিস্তান আমলে দাঙ্গাবাজরা জয়ী হয়নি। জয়ী হয়েছে মানবতা, যার ফলে দেশ স্বাধীন হয়েছে। এরকম সাড়া দেওয়ার ঘটনা সর্বশেষ হয়েছিল ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিক্রিয়ায় ঢাকায় গোলযোগের সময়।

এখন সেরকম দাঙ্গা না হলেও এক দুর্গাপূজায় তিন জায়গায় অন্তত ছয়জনের প্রাণহানি মোটেও মেনে নেওয়ার মতো ছোট ঘটনা নয়। কোথাও প্রতিবেশী মুসলমানরা টুঁ শব্দ করেনি, এগিয়ে আসেনি। ঢাকায় সংস্কৃতিসেবীরা ধীরে-সুস্থে সাড়া দিতে শুরু করেন। আওয়ামী লীগ পথে নেমেছে ৬ষ্ঠ দিনে, গতকাল মঙ্গলবার। মুসলমানরা পাশে না দাঁড়ালে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে কিছুতেই সাহস, ভরসা ও আস্থা সৃষ্টি হতে পারে না। তাহলে কি হৃদয় ভেঙে যাওয়া এই জনগোষ্ঠীর অশ্রুমোচন করে নীরবে দেশত্যাগ বাড়বে? সেটা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা কোনটা বাড়াবে? তাই জানমাল রক্ষায় সরকারের দায়িত্ব সরকার পালন করবে। আমরা সেটা দাবি করব, আশা করব। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানসহ নাগরিক সাধারণকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বিপন্ন সংখ্যালঘুর পাশে সক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়েই সম্প্রীতির প্রমাণ দিতে হবে।
২.
সদ্য সমাপ্ত দুর্গাপূজার অষ্টমীতে ১৩ অক্টোবর বুধবার ভোরে কুমিল্লা শহরের নানুয়াদিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফের কথিত অবমাননার প্রচার চালিয়ে দেশের আরও অনেক স্থানে মন্দির আক্রমণ-ভাঙচুর ও প্রাণহানির যে ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলো ঘটেছে তাকে কি বিনা মেঘে বজ্রপাত বলে ভাবতে হবে? ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে ১২টি বৌদ্ধবিহার ও মন্দিরে ধ্বংসযজ্ঞ-অগ্নিসংযোগ তাণ্ডবের পর থেকে গত কয়েক বছর কি একই ধরনের ঘটনা বার বার ঘটেনি? ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে, ২০১৭ সালে রংপুরের গঙ্গাচড়ায়, ২০১৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে, ২০১৯ সালে ভোলার বোরহানউদ্দিনে, এই তো গত মার্চে সুনামগঞ্জের শাল্লায় হিন্দুপল্লিতে? প্রতিটি ঘটনায় একই ছকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, দরিদ্র, অসহায় কোনো মানুষের নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে, যা ভুয়া হওয়াই স্বাভাবিক, ইসলাম ধর্মের অবমাননাসূচক কিছু লেখা বা ছবি পোস্ট দিয়ে তা প্রচার করে উত্তেজনা সৃষ্টি, মিছিল বের করে হাঙ্গামা, মন্দির ও বাসাবাড়িতে হামলা, লুটপাট, ভীতি ছড়ানো ইত্যাদি। ওই ঘটনাগুলোয় বৌদ্ধ ও হিন্দুদের নাম যথাক্রমে উত্তম বড়ুয়া, রসরাজ দাস, টিটু রায়, সঞ্জু বর্মণ, বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য ও ঝুমন দাস।
রামুর উত্তম বড়ূয়া হারিয়ে গেছেন। পুলিশ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে অন্যদের জেলহাজতে ঢুকিয়েছে, কারও ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে জামিন বিলম্বিত হয়েছে। পরে জামিনে বেরিয়ে নিভৃত জীবনযাপন করছেন। কিন্তু হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া সবাই জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়; একজনকেও সাজা দেওয়ার মতো মামলা এগিয়ে নিতে পারে না পুলিশ।
কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাককে বিবিসিতে বলতে শুনলাম, গত ১৩ বছর আওয়ামী লীগের টানা শাসনকালে এই প্রথম দুর্গাপূজায় কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটল। আগে কখনও দুর্গাপূজার সময় ঘটেনি।
অবশ্যই পুজোর সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক থাকে। আমরা এটাও দেখব যে, রামু থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত উল্লেখিত ঘটনাগুলো আওয়ামী লীগের শাসনামলেই ঘটেছে।
আমরা এটাও ভুলব না যে, স্বাধীনতা-উত্তর সমকালীন ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আকারে সারাদেশে সংঘবদ্ধভাবে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ পরিচালিত হয়েছিল ২০০১ সালে ১ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের পরে। প্রতিশোধমূলক আক্রমণের নিশানা করা হয়েছিল জেলায় জেলায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ও সাধারণ হিন্দুদের। সে হামলা পরিচালিত হয় ক্ষমতা গ্রহণে নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ মদদে, যার অভিঘাত পরবর্তী দুই দশক দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে। বিপরীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে সাম্প্রদায়িক গোলযোগগুলো হয় সরকারবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ধর্মব্যবসায়ী ও ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দ্বারা চক্রান্তমূলকভাবে।
কুমিল্লার পরে পরপর ঘটল চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে, নোয়াখালীর চৌমুহনী, ফেনী শহরে একর পর এক মন্দির ও দোকান-বাড়িতে এবং সর্বশেষ রোববার বিকেলে রংপুরের পীরগঞ্জে মাঝিপাড়ায় অগ্নিসংযোগ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা কার্যক্রম এমন ব্যর্থ হলো কেন? চক্রান্তের কিছুই আগে জানতে পারল না? জঙ্গি দমন কার্যক্রমে বাহিনীগুলোর এক্ষেত্রে দক্ষতা আমরা দেখছি। বিরোধী রাজনৈতিক দল কমিটির সভা করলেও নাশকতার পরিকল্পনা করছিল বলে ধরে নিয়ে আসে। তাহলে?
আমাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে এজন্য যে, ভারতে আমাদের সংলগ্ন ত্রিপুরায় ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নির্বাচনের জন্য সাম্প্রদায়িক ইস্যু তৈরি করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার বিজয়ার শুভেচ্ছা দেওয়ার বাণীতে স্পষ্টভাবে ভারতকেও সতর্ক করেছেন যেন সে দেশে এমন কিছু না ঘটে যার প্রতিক্রিয়ায় আমাদের দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত আসে।
গোয়েন্দা ব্যর্থতার পাশাপাশি আরেকটি কথা। রামু, নাসিরনগর ও শাল্লায় হামলাকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিভিন্ন সংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীদের দেখা যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নাসিরনগরের মন্দির ভাঙচুর মামলায় পুলিশের চার্জশিটভুক্ত দুই আসামিকে আগামী ১১ নভেম্বর ভোট গ্রহণের জন্য নির্ধারিত চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কায় মনোনয়ন দেওয়া হয়। মিডিয়ায় প্রকাশ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তা অবশ্য বাতিল করা হয়েছে কিন্তু এতে দলটির ভেতরের গভীর দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতারা কী বলবেন?
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Facebook Comments Box

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০