মঙ্গলবার, ২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সব

Singapore
Corona Update

Confirmed Recovered Death
59,879 59,746 29

Bangladesh
Corona Update

Confirmed Recovered Death
543,717 492,059 8,356

‘ঢাবির ছাত্রদের মন্তব্যের অবস্থা দেখে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি’

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন | ২০ জুন ২০২১ | ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ
‘ঢাবির ছাত্রদের মন্তব্যের অবস্থা দেখে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি’

পৃথিবীর বড় বড় শহরগুলোর যেটি যেখানে সেটি সেখানে না হয়ে অন্য কোথাও হলো না কেন? কোন একটি জায়গাকে শহর হিসাবে বেছে নেওয়ার অনেকগুলো কারণের অন্যতম কারণ হলো নদী। প্রাচীনকাল থেকেই সাধারণত নদীর পাশেই গড়ে উঠে একটি শহর। ইংল্যান্ডের রাজধানী বিখ্যাত লন্ডন শহর অবস্থিত থেমস নদীর পারে। বর্তমান পৃথিবীর রাজধানী খ্যাত নিউ ইয়র্ক শহর হুডসন নদীর পারে অবস্থিত। রাশিয়ার সবচেয়ে বড় শহর হলো মস্কো এটি Moskva River এর পারে অবস্থিত। রাশিয়ার দ্বিতীয় ইনফ্যাক্ট সবচেয়ে বিখ্যাত শহর হলো সেইন্ট পিটসবার্গ। এটি নেভা নদীর পারে অবস্থিত। চীনের বেইজিং শহর ইনডিং নদীর পারে অবস্থিত।

কেন প্রায় ৪০০ বছর আগে মুঘল আমলে ঢাকাকে এই এলাকার রাজধানী হিসাবে বেছে নেয়। বেছে নেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ ঢাকাই পৃথিবীতে একমাত্র শহর যার চারপাশে অন্তত চার চারটি নদী আছে এবং অংসংখ্যা খালা ছিল। এতগুলো নদী এবং এত খাল বেষ্টিত শহর পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কোন শহর পৃথিবীতে নেই। একটি ভিডিও দেখলাম। কমেন্ট থ্রেডে এটি সংযুক্ত করলাম। কষ্ট করে দেখবেন প্লিজ। অন্তত ১২.২৫ মিনিট থেকে।

পৃথিবীতে যদি একটি মাত্র দেশ থাকতো তাহলে সেই দেশের রাজধানী যৌক্তিকভাবে কোথায় হতো? যদি পৃথিবীর সকল মানুষের অবস্থানের গড় নেই তাহলে সেই অবস্থানটি হয় দক্ষিণ এশিয়ায়। এটাই হতো অপটিমাম অবস্থান যেখানে আমরা সবাই থাকতে চাইতাম। আরো নির্দিষ্ট করে যদি বলতে চাই তাহলে সেই শহরটি কোথায় হতো? সমুদ্র, নদী মিনারেল নেভিগ্যাবল অবস্থান ইত্যাদি সবকিছু বিবেচনায় নিলে the single best place for a city on Earth হতো আমাদের বাংলাদেশের রাজধানী ‘ঢাকা’। শুনে আশ্চর্য হলেন?

পৃথিবীতে আরেকটি দেশের রাজধানী বা শহরের নাম বলতে পারবেন না যার চারপাশে চার থেকে পাঁচটি বড় নদী আছে? যার ভিতরে শত শত খাল ছিল? কল্পনা করা যায়? এইরকম একটি শহর যদি ইউরোপের কোন দেশের থাকতো বা আমেরিকার থাকতো কিংবা জাপান বা চীনের থাকতো কি বানাতো তারা!

আর এইরকম একটি শহরকে আমরা পৃথিবীর নরক বানিয়েছি। ঢাকা শহর এখন বসবাসের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে অবাসযোগ্য শহর। মানে যেই শহর হওয়া উচিত ছিল পৃথিবীর সেরা শহর সেই শহর সবচেয়ে অবাসযোগ্য খারাপ শহর। শুধু তাই না। দিন যত যাচ্ছে উন্নয়নের নামে এটিকে আরো বেশি করে হত্যা করা হচ্ছে। এটি হতে পারতো প্রাকৃতিকভাবেই ভেনিস শহর। আমরা ভেনিসের ওয়াটার বোট দিয়ে শহরের নানাপ্রান্তে যেতে পারতাম। শুধু তাই না সারা দেশের সাথে নদী পথে কানেক্টিভিটি তৈরী করতে পারতাম। বাংলাদেশতো নদীমাতৃক দেশ ছিল। শত শত নদী মাকড়সার জালের মত সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিল। ঢাকার মত একটি শহর যদি পৃথিবীর সবচেয়ে অবাসযোগ্য হয় তাহলে এর দায় কার? এর দায় হলো যারা এই দেশকে শাসন করেছে। তারা জানেই না কোন সৌভাগ্যে তারা ঢাকার মত একটি শহরকে রাজধানী হিসাবে পেয়েছে। ঢাকা হলো বাংলাদেশের একদম সেন্টারে। ঢাকা কারো দয়ায় ঢাকা হয়ে উঠেনি।

রুয়ান্ডার নাম আমরা কমবেশি সবাই শুনেছি। রুয়ান্ডায় তিনটি group বিদ্যমান Hutu, Tutsi and Twa! ৯০এর দশকে Hutu এবং Tutsi এইদুই group এর মধ্যে সংঘর্ষ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। ফলে ওখানে genocide ও ঘটে। যেই সময়টায় এইসব ঘটছিল সেসময়টা বাংলাদেশ কেবল স্বৈরাচার সরকারকে হটিয়ে তথাকথিত গণতন্ত্র এসেছিল। সেখান থেকে আজ রুয়ান্ডা কোথায় আর আমরা কোথায়। সেই উত্তাল সময় পারি দিয়ে রুয়ান্ডার রাজধানী আজ আফ্রিকার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়েছে। আর আমাদের দেশ বা আমাদের রাজধানী? দিন যতই যাচ্ছে ততই আরো অধঃপতনের দিকে এগুচ্ছি।

আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশটি যার জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে আমাদের দেশের মতই তারপরও কিভাবে তারা এই অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করল? এইসবের কৃতিত্ব সেখানকার সরকারের। আমাদের সরকারও যদি চায় অতি অল্প সময়ে বদলে দিতে পারে এই দেশকে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সরকার যদি তার দলের সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে একটি সুদূর প্রসারী চিন্তা নিয়ে আগায় পরিবর্তন কোন ব্যাপারই না।

রুয়ান্ডায় পলিথিন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভোর পাঁচটার মধ্যে শহরকে একবার পরিষ্কার করা হয় আবার সারাদিন ধরে এই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নের কাজটি বজায় রাখা হয়। এখানে এবং কমেন্ট লিংকে আরো একটি ভিডিও সংযুক্ত করলাম। নিজ চোখে দেখুন। তাহলে বুঝতে পারবেন আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশটি যদি পারে আমরা কেন পারব না?

রুয়ান্ডা মনে করে যে শিক্ষাই উন্নতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সেই জন্য তারা ২০১২ থেকে ক্রমাগতভাবে শিক্ষায় বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়েই যাচ্ছে। ২০১২ সালে যেখানে মোট বাজেটের ১৭% ছিল শিক্ষায় ২০১৮ সালে সেটা হয় ২২%! আর আমরা শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ কেবল কমাচ্ছি! শিক্ষা খাতে রুয়ান্ডা তাদের জিডিপির ৩.৫ থেকে ৫.৫% বরাদ্দ দিয়ে থাকে। আর আমরা ২% এর আশেপাশে। এই দুঃখ কোথায় রাখি! বলদামি আর কারে কয়? অথচ আমাদের জনসংখ্যা, তাদের মান ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে তাদেরকে উন্নত মানসিকতার তৈরী করতে হলে পথ একটাই। সেটি হলো মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত করা।

গত দুইদিন আগে ঢাকাতে অভূতপূর্ব একটি ঘটনা ঘটে যায় যা এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। ধর্ষণ ও হত্যা চেষ্টার বিচার চেয়ে চিত্র তারকা পরীমনির নিজের ভেরিফাইড ওয়ালে লেখা স্টেটাসে হাজার হাজার কমেন্ট পড়েছে। পরাটাই স্বাভাবিক। তার প্রায় ৯২ লক্ষ ফলোয়ার। কারা এই ফলোয়ার? সেই কমেন্টগুলো নিশ্চই তার ফলোয়াররাই করেছে। এই ফলোয়াররা তার ওয়ালে সারাদিন পরে থাকবে, তার স্বল্প বসনার ছবি দেখে সুখ নিবে কিন্তু একই সাথে সে ধর্ষণ কিংবা হত্যার মত জঘন্য ঘটনার মত অবস্থায় পরবে তখন তাকে গালমন্দও করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ফেইসবুক গ্ৰুপে কেউ একজন পরীমনির অভিযোগকে একটু সাপোর্ট করে একটি পোস্ট দেয় এবং সেটি আমার নজরে আসলে পড়লাম। সেখানকার কিছু কমেন্ট হলো এইরকম: ১। অনেক লাইক পাইবেন। ২। মেয়ে অভিযোগ করার সাথে সাথেই তা পুরোটা বিশ্বাস করা কি যৌক্তিক?

৩। নাসিরের মানহানি মামলা করা উচিত। যাদের চামড়া টাকা দিয়ে কিনতে পাওয়া যায়,তাদের কেউ ধর্ষণ করবে! এটা হাইস্যকর।

৪। টাকা পয়সা কম দিয়েছিল মনে হয়, সেজন্যই জাস্ট একটা ছোটোখাটো ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। মন্তব্যকারীরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী!

এরা এইটা বুঝতেও অক্ষম যে এই সমাজে একটা নারী এমনি এমনি ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ করে না। আমাদের মত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রকাশ্যে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ করা এত সহজ না। কেউ মিথ্যা মিথ্যা এইরকম অভিযোগ করে নিজের জীবনকে আরো বিপন্ন করার মত পরিস্থিতি নিজেই তৈরি করবে না।

খোদ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মন্তব্যের অবস্থা দেখে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। পৃথিবীর কোন সভ্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এমন মন্তব্য কল্পনাতীত। এটাও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় মাপার একটা ইনডেক্স হতে পারে। মেয়ে বাহিরে যায় সমস্যা। মেয়ে ক্লাবে যায় আরো বেশি সমস্যা। মেয়ে নাটক করে তাই চরিত্র খারাপ। মেয়ে ছেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয় চরিত্র খারাপ। পৃথিবী কোথায় চলে গেছে আর আমরা এখনো প্রিমিটিভ আর আদিম চিন্তার ভেতর ডুবে আছি। এতসব পড়াশুনা করে কি লাভ হচ্ছে?

ঢাকা শহরের আজকের এই অবস্থাই প্রমান করে আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের যথাযোগ্য রোল প্লে করতে পারছে না। আমাদের সরকারেরা যেখানে তার খোদ রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম না সেখানে বাকি আরো বড় বড় সমস্যা কিভাবে সমাধান করবে? এইসবই জাস্টিফাই করে কেন শিক্ষাখাতে আমাদের আরো অনেক বিনিয়োগ করে সেই বিনিয়োগকে যথাযোগ্য ভাবে কাজে লাগানো যায়।

পৃথিবী দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের কায়িক পরিশ্রম করে উপার্জনের দিন শেষ হতে যাচ্ছে। এক সময় রোবটই সকল কাজ করবে। মানুষ কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক কাজই করবে। সেই সময়ের জন্য কি আমরা তৈরী হচ্ছি। প্রশ্ন রেখে গেলাম। আগামীর প্রজন্মের জন্য এখনি যদি কিছু না করি তারা আমাদের ক্ষমা করবে না। (ফেসবুক থেকে নেয়া)

লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments Box

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১