মঙ্গলবার, ২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সব

Singapore
Corona Update

Confirmed Recovered Death
59,879 59,746 29

Bangladesh
Corona Update

Confirmed Recovered Death
543,717 492,059 8,356

পরিবেশ : মানুষ টানেলের প্রান্তে আলো দেখতে চায়

সালাহউদ্দিন বাবর | ১৩ জুন ২০২১ | ৫:৪৮ অপরাহ্ণ
পরিবেশ : মানুষ টানেলের প্রান্তে আলো দেখতে চায়

ঘটনা যেন অনেকটা এমন, ব্যাধিটা গুরুতর কিন্তু সুপ্ত হয়ে আছে অনেক দিন, কোনো কিছুই বোঝা যায়নি। তার পর যখন উপসর্গের প্রকাশ পেতে শুরু করে তখনই উদ্বেগ উৎকণ্ঠা সৃষ্টি আর জ্বালা যন্ত্রণা শুরু। কাতর হয়ে তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হওয়ার দশা। বৈশ্বিক পরিবেশের অবনতি, আবহাওয়ায় চিরাচরিত শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়ে পড়া, বিশ্বজগতের উষ্ণতা স্বাভাবিক মাত্রা অতিক্রম করা আর সুপেয় পানির সঙ্কট- এসব ঘটা শুরু হয়েছে বহু আগেই। যাদের কারণে এসব ঘটেছে তাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এসব বিষয়ে সতর্ক বার্তা তাদের অনেক আগে থেকেই দিয়ে যাচ্ছিল। সেসব দেশের বাইরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই অবনতি কিছুটা অনুভব করছিল বটে; কিন্তু প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকায় তাদের হাতে তথ্য প্রমাণ তেমন ছিল না। বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি উন্নত দেশের স্বার্থের ক্ষতির কথা ভেবেও এ বিপর্যয়ের ব্যাপারে তারা নীরব থেকেছে যাতে এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ হইচই বেঁধে না যায়। বলাবাহুল্য, সেই গুটিকয়েক দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব যেন পড়তে না পারে, এই মুহূর্তে সে জন্য এমন লুকোচুরি খেলা খেলেছে। উল্লেখ্য, স্বল্পসংখ্যক দেশের শত শত শিল্প স্থাপনা থেকে প্রতিনিয়ত বিপুল কার্বন নিঃসৃত হচ্ছে। তা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের জলবায়ু, পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি এবং ক্রমাগত উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে, যা আবহাওয়ার ভারসাম্য নষ্ট আর কোটি কোটি বছরের প্রাকৃতিক নিয়মশৃঙ্খলা তছনছ করে দিচ্ছে। এমন বিপর্যয়কে যদি রোধ করা না যায় তবে শত শত কোটি মানুষকে নিয়ে এই বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন এই গ্রহ হারিয়ে যাবে এই গ্যালাক্সি থেকে।

বিশ্বের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা অন্যতম। ব্যক্তিবিশেষ জেনেশুনে ভুল করলে তাকে ‘জ্ঞানপাপী’ বলা হয়। কয়েকটি দেশসহ পুরো মানবজাতির বছরের পর বছর অজ্ঞতা প্রদর্শন আর সতর্কবাণী উপেক্ষা করে নিজেদের হাতে বিশ্বকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে চলেছে। তার কোনো সংজ্ঞা কি তৈরি হয়েছে? এখন বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মোকাবেলা করতে যত বেশি দেরি হবে তা ততই কঠিন হওয়ার পাশাপাশি এর ব্যয়ভারও বেড়ে যাবে বহুগুণ।

সম্ভবত এতকালের নীতি-নৈতিকতার স্খলন, অনুতাপের সৃষ্টি করতে পারে, বিশ্বব্যাপী মানুষের ধিক্কার নিয়ে চিন্তিত হওয়া, সর্বোপরি সেই উন্নত দেশগুলোর প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠা প্রকৃতির ক্রোধ উত্থিত হয়ে উঠে তাদের ছোবল দেয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। সে জন্য পরিবেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ অভিযুক্ত সেই উন্নত দেশগুলোর বিশ্বের ক্রমাবনতিশীল পরিবেশকে রুখতে নড়েচড়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ফোরাম গঠন করে তাদের নিঃসৃত কার্বনের মাত্রা কমানোর কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজে নামতে বৈঠক করে চলেছে। জানি না তারা কতটা আন্তরিকতার সাথে করে বিশ্বকে বিপদমুক্ত করতে ব্রতী হবে। তবে বিশ্ববাসী তাদের কাজের সাফল্য কামনা করে এবং টানেলের শেষ প্রান্তে আলোর বিচ্ছুরণ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

পৃথিবীর যেসব দেশ উষ্ণায়ন ও অন্যান্য কারণ আর পরিবেশের বিপর্যয়জনিত সমস্যায় বিপর্যয়ের মুখোমুখি, জলবায়ুর হাজার বছরের শৃঙ্খলা ভেঙে যাওয়ায় সৃষ্ট মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন, সে তালিকায় বাংলাদেশ সম্ভবত শীর্ষ পর্যায়েই রয়েছে। আগেই তা উল্লেখ করে এসেছি। এমন পরিস্থিতির জন্য সামষ্টিক সতর্কতা বোধের উন্মেষ এখন জরুরি। এ জন্য বাংলাদেশের আয়োজন ও প্রচেষ্টা এই সমস্যার গুরুত্বের তুলনা এতই অপ্রতুল যে, তা নিয়ে শত বছরেও এটা আরোগ্যের আওতার বাইরে চলে যাবে। প্রশাসনিক তথা সরকারি প্রচেষ্টা এখনো নিছক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পরিবেশগত বিপর্যয় রুখতে যত দেরি করা হবে, ততই ক্ষতি বাড়বে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশের যে মারাত্মক অবনতি ঘটছে তার বহুমুখী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এর মধ্যে পানিসঙ্কট অন্যতম। বাংলাদেশ যেহেতু এই সঙ্কটে এখন নাকাল, আমরা এই আলোচনায় তারই ওপর বলার চেষ্টা করব। অন্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা এই স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। আজ বাংলাদেশের সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে নগর-মহানগরবাসী তীব্র পানি সমস্যায় ভুগছে। এই সমস্যার স্বরূপ এতটা প্রকট যে, তা দেশে সব মানুষের খাদ্যসঙ্কট সৃষ্টি করছে আর সুপেয় পানি পানের সুযোগটা পেতেও কষ্টে আছে। অন্যান্য ব্যাপারেও যে ‘অ্যাডহক’ ব্যবস্থা নেয়া হয় এ ক্ষেত্রেও সেটাই পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। প্রশাসনকে এ নিয়ে ততটা উদ্বিগ্ন বলে মনে হয় না।

অথচ কিছুকাল পূর্বেও পানি নিয়ে দেশে কারো তেমন কোনো চিন্তাভাবনা ছিল না। বছর ত্রিশেক আগে পানি নিয়ে সম্ভবত প্রথম সতর্কবাণী শুনতে পাই বুয়েটের তৎকালীন পানিসম্পদ বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর আইনুন নিশাতের কণ্ঠ থেকে। এখনো তিনি পানি নিয়ে তার চিন্তাভাবনা লেখালেখি অব্যাহত রেখেছেন। সে সময় আমি নিজে তরুণ রিপোর্টার, দেশের নদ-নদীর পানিপ্রবাহসহ পানিসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তার জ্ঞানগর্ভ কথা শুনেছি আর তা যতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম তা নিয়ে রিপোর্ট করেছি পত্রিকায়। পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে তার সাক্ষাৎকারও নিয়েছি। আজকে তার একটা কথা স্মরণ না করলে বোধহয়, অকৃতজ্ঞতা হবে। ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বর্ষার পানি গ্রীষ্মের জন্য সঞ্চয়ের লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে সারা দেশের হাজামজা খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাই এ শুভ প্রচেষ্টাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সমালোচনা করতেন। বলতেন, ‘জিয়া খাল কেটে কুমির আনছে’। সম্ভবত এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সারা দেশ থেকে বহু সাংবাদিক নিয়ে কক্সবাজার গিয়েছিলেন সদ্য খননকৃত উথলী খালের হালহকিকত দেখানোর জন্য। আমিও সেই সফরে ছিলাম। আমাদের উথলী খালের পাশে নিয়ে গিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি নাতিদীর্ঘ বক্তব্যে বললেন, আপনারা দেখুন, মানুষের কাছ থেকে শুনুন জানুন। এই খাল কেটে কুমির আনা হয়েছে কি না, নাকি অন্য কিছু হয়েছে। দেখলাম, দীর্ঘ এই খালে প্রচুর পানি, খালের দুই তীরে বহু ফলদ বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। মাছ চাষের ব্যবস্থা হয়েছে। অথচ এই খাল পুনঃখননের আগে হাজামজা ছিল বলে স্থানীয় মানুষ জানায়। বহু মানুষের কাছ থেকে জানলাম। খাল খননের আগে এই এলাকায় কেবল বর্ষাকালে একটিমাত্র ফসল ফলানো যেত। এখন এই খাল থেকে সেচসুবিধা নিয়ে কৃষকরা একাধিক ফসল ফলাতে পারছেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া সে সময় সারা দেশে বহু খাল পুনর্খনন এবং সংস্কার করেছিলেন। এসবই স্বেচ্ছাশ্রমে করা হয়েছিল। বস্তুত তখন খাল খনন নিয়ে দেশে একটা জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। আজো এমন কর্মসূচি গ্রহণ করা হলে কৃষক যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি দেশের পানি সঙ্কটের খানিকটা হলেও উপশম ঘটতে পারে। এমন উদ্যোগ নেয়ার অর্থ এই নয় যে, শহীদ জিয়ার অনুসরণ করা হচ্ছে। বরং দেশের প্রয়োজনটাকেই প্রাধান্য দেয়া হবে।

আজ দেশে নীতিনির্ধারক তথা কাণ্ডারি থেকে শুরু করে পানি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ এমনকি সাধারণ কৃষক পর্যন্ত পানিসঙ্কট নিয়ে উদ্বিগ্ন। কৃষকরা পানির অভাবে ফসল ফলাতে পারছেন না। আগে গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত ও বসন্তের যে শৃঙ্খলা ছিল তা আর নেই। নদী-খাল-বিলসহ পানির সব আধার শুকিয়ে যাচ্ছে, নদীতে যোজনকে যোজন পলি জমে চর পড়েছে। পানির সেই নাব্যতা তথা প্রবাহ আজ আর বজায় নেই। তাই সেচসুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। আর ভূগর্ভের পানিও কমে গেছে। সাধারণত ভূগর্ভের পানির পরিপূরণ বা পুনর্ভরণ হয় বৃষ্টির পানির মাধ্যমে। মেঘ থেকে বারিধারা মাটিকে সিক্ত করত আর তা নিম্নমুখী হয়ে ধীরে ধীরে পানির স্তরে প্রবেশ করত; প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ভূগর্ভের পানির স্তরের ঘাটতি কমিয়েই দিত। পানি সিক্ত পরিসরের আওতায় থেকে গাছপালা, পোকামাকড়, জীবাণু ইত্যাদি প্রয়োজনমতো পানি গ্রহণ করে বাঁচত; শস্যের ফলন, ফল-ফলাদি যথারীতি জন্মাত। কিন্তু এখন পানির প্রাপ্যতা নিয়ে সঙ্কট এতটা তীব্রতর হয়েছে যে, কৃষিকাজে ও পরিবেশ প্রকৃতির জীববৈচিত্র্যের জন্য প্রচণ্ড সমস্যার সৃষ্টি করেছে। তার জেরে অনেক কিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

বিশ্ব পানি সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ করে একাধিক দেশের অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে পানি বিশেষজ্ঞ কূটনৈতিক মহল, সমরবিশারদরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন যে, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের শুধু অবনতি তিক্ততার সৃষ্টির সম্ভাবনাই শুধু নয়, তা নিয়ে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমাদের এই উপমহাদেশেও পানি বণ্টন, একতরফা বাঁধ নির্মাণ নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে চাপা ক্ষোভ সঞ্চিত হয়ে রয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানে এমন অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে প্রায়ই হুমকি ধমকি শোনা যায়। ভারতের দৃষ্টিতে দরকষাকষির বিষয়ে বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়ায় পানি নিয়ে ভারতের ভূমিকা ও কার্যক্রমে বাংলাদেশের স্বার্থের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে এ দেশে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়া তীব্রতর হতে চলেছে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর সময় বলা হয়েছিল যে, ‘এখন এই বাঁধ কেবল পরীক্ষামূলকভাবেই চালু করা হচ্ছে।’ কথা দেয়া হয়েছিল ‘বাঁধ পুরোপুরি চালুর আগে বাংলাদেশের স্বার্থের দিকটি বিবেচনা করে ন্যায়ভিত্তিক পানি বণ্টন চুক্তি করা হবে।’ পরে ভারত কিন্তু এ কথার ওপর স্থির থাকেনি। ফলে বাংলাদেশের পদ্মা ও তার শাখা নদীগুলো শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পরিবেশ, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। একইভাবে তিস্তা নদী নিয়ে বাংলাদেশের ভোগান্তির কোনো শেষ নেই। ফারাক্কা নিয়ে যেমন ওয়াদা ভঙ্গ করা হয়েছিল তেমনি তিস্তা নিয়ে সেই একই খেলায় মেতে আছে ভারত। বঞ্চনার এখানেই শেষ নয়, ভারত এখন বহু অভিন্ন নদীতে একতরফাভাবে বাঁধ নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এ দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে চীনও নিজ ভূখণ্ডে বাঁধ নির্মাণকাজ করে চলেছে যা বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করবে। এ অঞ্চলে এখন পানি নিয়ে ভেতরে ভেতরে চরম ক্ষোভ আর উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে।

পদ্মাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি হ্রাস পাওয়ায় দেশের নৌরুট তথা জলপথ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। দেশের ৩১২টি নদ-নদীর জলপথ মাত্র ছয় হাজার কিলোমিটার, যা অতীতে ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। নৌরুটে এই ভয়াবহ নিম্নমুখী ট্রেন্ড দেশের জন্য মারাত্মক হতাশাব্যঞ্জক আর আগামীতে মহাবিপর্যয়ের ইঙ্গিত। তা ছাড়া অর্থনীতি আর জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে মূল্যায়ন করলে ক্ষতির পরিমাণ যে কত তা হিসাব করা দুরূহ। নৌরুটে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন অনেক সাশ্রয়ী। নদীপথের প্রবাহ কমে যাওয়ার সাথে সাথে পানির লবণাক্ততাসহ নানা জটিলতা পাওয়ায় সমুদ্রের জোয়ারের সময়ে পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে উজানে চাঁদপুর পর্যন্ত তা পৌঁছে যাচ্ছে। সেই সাথে বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সমুদ্রের পানির স্তর বেড়ে চলেছে। দেশের দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের জোয়ারের সময় লবণাক্ত পানি বহু স্থানে প্রবেশ করছে। মাটিতে এর ফলে লবণের স্তর পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তা ছাড়া লবণাক্ত পানি মাটির ক্ষতিসহ শস্যের এবং গাছগাছালি, গুল্মলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে অঞ্চলে অগভীর নলকূপের পানি লোনা হয়ে যাওয়ায় তা পান করা বিপজ্জনক এবং পেটের পীড়াসহ নানা দৈহিক সমস্যার সৃষ্টি করছে।

রাজধানী ঢাকার পানি সঙ্কট, ওয়াসার সরবরাহকৃত পানির মান নিয়ে বহুকাল থেকে ওজর-আপত্তি-অভিযোগ আছে। তা ছাড়া ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করে তা অপর্যাপ্ততার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ এবং প্রায়ই এ জন্য মিছিল বিক্ষোভ পর্যন্ত লক্ষ করা যায়। যতদূর জানা যায়, ওয়াসার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ছাড়াও ঢাকায় ৬৫১টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত কোটি কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হয়েছে। ঢাকায় ওয়াসার চারটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট আছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এতে ‘হেভি মেটাল’ থাকায় পানি শোধন করতে তীব্র ও অধিক কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটি কোনোভাবেই অবহেলা করার মতো নয়। ঢাকায় সরবরাহের জন্য ৬৫১ গভীর নলকূপের মাধ্যমে যে পরিমাণ পানি তোলা হচ্ছে তা এখানকার গাছপালার মারাত্মক ক্ষতি সাধন করছে। বিপুল পরিমাণে পানি উত্তোলনের ফলে প্রতিনিয়ত পানির স্তর মাটির নিচে নেমে যাচ্ছে। তাতে গাছপালা গুল্মলতার পক্ষে বেঁচে থাকার মতো প্রয়োজনীয় পানি মাটির উপরিভাগে থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বোপরি ঢাকায় অনেক বহুতল ভবন রয়েছে এবং আরো তৈরি হচ্ছে। ভূগর্ভের পানি স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ায় এসব ভবন দেবে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন এ-সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরা।

বৈশ্বিক উষ্ণতা, আবহাওয়া মণ্ডলের বিশৃঙ্খলা, প্রাকৃতিক ভারসাম্যের মারাত্মক অধঃগতি, সুপেয় পানির প্রাপ্তির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়া- এসব সমস্যায় বিপর্যস্ত হয়ে দিশেহারা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থাও শোচনীয়। যে দেশ নদীমাতৃক বলে স্বীকৃত ছিল সে দেশে নদীর নাব্যতা এত বেশি এখন হ্রাস পেয়েছে- শুষ্ক মৌসুমে তা শুকিয়ে ‘কাঠ হয়ে’ যাচ্ছে। এসব নদীর পানিকে কেন্দ্র করে দেশে যেসব সেচ প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল সেগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে লাখ লাখ হেক্টর জমিতে ফসল ফলানো ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গেছে। ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক বনায়ন পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যেতে বসেছে। গুল্মলতা কোনোভাবেই অবহেলা করার মতো নয়। প্রাকৃতিক কারণে এসবের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু ভূমির উপরিভাগ শুষ্ক হয়ে পড়ায় এসবের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে।

পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পানিসঙ্কট নিয়ে পানিনীতির আওতায় সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেয়া কতটা জরুরি তা দেশের সাধারণ কৃষক ও অন্যান্য ভুক্তভোগীকে বুঝিয়ে বলার দরকার না হলেও দেশের হর্তাকর্তাদের কেউ দ্বিমত করবেন না। এ দিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ সমস্যা নিয়ে সজাগ থেকেও যেন ঘুমিয়ে আছে। এ পর্যন্ত তাদের কোনো কার্যক্রম নজরে আসেনি। অথচ বৈশ্বিক অবস্থা ও বাংলাদেশের শোচনীয় পরিবেশের সুরক্ষার জন্য তাদের অস্থির হওয়ার কথা। তাই তাদের ঘুম ভাঙানোর জন্য পানি বিশেষজ্ঞ বোদ্ধা দেশহিতৈষী সচেতন মানুষ সাংবাদিক সমাজ- তাদের নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজস্ব অবস্থান থেকে কাজ করা এখন দেশের দাবি। জানি, এ ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা; বিশেষ করে আমাদের প্রশাসনের বহু হর্তাকর্তা মনে করেন দেশের ভালো করার চিন্তা চেতনার একক দায়িত্ব তাদেরই। এ নিয়ে পরামর্শ দানকে তারা তাদের ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে নাক গলানো বলে মনে করেন। এমনকি তাদের কাজের খোঁজখবর নেয়াটাও ‘গর্হিত’ বলে তাদের ধারণা। এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা আর তাদের হাতে হেনস্তা হওয়ার অনেক ঘটনা ঢাকাসহ দেশের নানা স্থানে অহরহ ঘটে থাকে। এমন অহমিকায় তারা ভোগেন বলে মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা তাদের স্মরণে থাকে না। অথচ তারা তো অনেক ক্ষেত্রেই পেরে উঠছেন না, যা দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হচ্ছে। এ ব্যাপারে অতি সাম্প্রতিককালের একটা উদাহরণ দিলে বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। কোভিড টিকা সংগ্রহ নিয়ে তাদের কত যে দুর্বলতা লক্ষ করা গেছে, তা বলে শেষ করা যাবেন না। সম্প্র্রতি চীনা টিকা নিয়ে যে লেজেগোবরের দশা তারা সৃষ্টি করেছেন, তা দেশের সম্মান ক্ষুণ্ণ তো করেছেই সেই সাথে বিপুল অর্থদণ্ড দিতে হবে দেশকে। তার জোগাড় কী তারা করবেন?

কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এসব শুধু বেমানানই নয়, এটি জবাবদিহিতার যে প্রথা আর গণতন্ত্রের বিশুদ্ধ থাকার যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি তার পরিপন্থী। এমন ঘটনা যদি সংসদীয় গণতন্ত্রের পীঠস্থান ব্রিটেনে ঘটত তবে বহু কাণ্ড ঘটে যেত। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সবার সীমা নির্ধারণ করা আছে। তা অতিক্রম করা কারো জন্যই শোভনীয় তো নয়ই, আইনের বরখেলাপ বটে। আজ যদি আমাদের জাতীয় সংসদ সত্যিকার অর্থে কার্যকর থাকত, তবে আগে যে কথাগুলো বলে এসেছি তা বোধ হয় বলা দরকার হতো না। দেশের জনপ্রতিনিধিরা সব কিছু নিয়ে সংশ্লিষ্টদের তুলাধুনা করে ফেলতেন। দুর্ভাগ্য, দেশে আক্ষরিক অর্থে সংসদীয় শাসন কায়েম রয়েছে কিন্তু তা আর প্রাণবন্ত নেই। সব গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য সংসদ হারিয়ে ফেলেছে।

দেশে বার্ষিক বাজেটে রাষ্ট্রের বছরব্যাপী অর্থনৈতিক নীতি-নির্ধারিত হয়। সেই নীতিতে পরিবেশের সমস্যাকে সংশ্লিষ্ট করা তথা পরিবেশের গুরুতর অবনতি থেকে উত্তরণের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দের কোনো তথ্য আমরা জানতে পারিনি। এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। যেখানে মানুষের চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে- প্রাণীকুল, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পথে; সেখানে বার্ষিক আর্থিক পরিকল্পনায় তার কোনো আভাস ইঙ্গিত না থাকাটা এ দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে চরম অবহেলা বলে মনে করতে হবে। প্রশাসনে বোধ-বিবেচনায় পরিবেশ বিষয়টির ঠাঁই কর্তাব্যক্তিদের মন-মগজে হতে পারেনি।

এবারো রুটিন মতো ‘বৃক্ষ রোপণ সপ্তাহ’ পালিত হয়েছে। নির্দিষ্টসংখ্যক বৃক্ষ রোপণও হয়তো হয়েছে। দীর্ঘকাল থেকে এমন সপ্তাহ পালিত হয়ে আসছে। এ জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থও যাচ্ছে। তবে এসব গাছ রোপণের পর তার কোনো ফলোআপ হয় বলে মনে হয় না। অর্থাৎ রোপিত গাছের কতটা বাঁচল, তার দেখভালের বিষয়টি হচ্ছে কি না, তারও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য কারো কাছে আছে বলে মনে হয় না। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার এতটুকু আগ্রহ আছে যে, এতকাল থেকে হাজার হাজার কিংবা লাখ লাখ গাছ রোপণ করা হলো তাতে তো গাছে গাছে ছেয়ে যেত দেশের পথ প্রান্তর। মানুষের নির্মল বায়ু সেবনের সুযোগ ঘটত। কিন্তু তা কোথায়? যদি রোপিত গাছগুলোকে বাঁচানো যেত তবে এত দিনে দেশের পরিবেশগত বিপর্যয় কিছু অন্তত ঠেকানো যেত। এটা হয়তো অনেকই জানেন ঢাকার রমনা থানাধীন এলাকা বিশেষ।

সর্বশেষ প্রকাশিত এক তথ্যে জানা গেছে বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের নতুন র‌্যাংকিং প্রকাশ করেছে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এই তালিকার শেষ দিক থেকে ৪ নম্বর স্থানে রয়েছে ঢাকা। বিভিন্ন দেশের শহরের ওপর জরিপ চালিয়ে ১৪০ শহরের র‌্যাংকিং প্রকাশ করা হয়েছে। এ তালিকায় ১৪৭ নম্বরে রয়েছে ঢাকা।

এটি হয়তো অনেকে জানেন, ঢাকার রমনা থানাধীন এলাকা, বিশেষ করে রমনা পার্ক আর তৎসংলগ্ন এলাকার পরিবেশ ঢাকা শহরের অন্যান্য স্থানের চেয়ে অনেক ভালো। সেখানে পরিবেশের চৎকার ভারসাম্য বজায় রয়েছে। এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সন্তোষজনক। রমনার এই ইতিবাচক অবস্থা বজায় থাকার কারণ আর কিছু নয়; মূলত রমনা পার্কের গাছগাছালি। এমন উদাহরণ থাকার পর আমাদের কর্মকর্তাদের ঢাকায় কি এমন আরো গ্রিন স্পট করার পরিকল্পনা নেয়া উচিত ছিল নয়? আমরা সবাই জানি, ঢাকা বায়ুদূষণের সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এমন গ্রিন স্পট হলে দূষণের মাত্রা খানিকটা হলেও কমতো।

Facebook Comments Box

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১