মঙ্গলবার, ২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সব

Singapore
Corona Update

Confirmed Recovered Death
59,879 59,746 29

Bangladesh
Corona Update

Confirmed Recovered Death
543,717 492,059 8,356

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে সারা দেহে তার এখন শুধুই পোড়া গন্ধ!

বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক : | ৩১ মার্চ ২০২১ | ১০:২৭ অপরাহ্ণ
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে সারা দেহে তার এখন শুধুই পোড়া গন্ধ! ছবি: ইন্টারনেট

আমাদের গৌরবময় মহান মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী যখন গোটা দেশব্যাপী উচ্ছাস-আনন্দে উদযাপন করছিল ঠিক তখনই ধর্মান্ধগোষ্ঠী আনন্দ খুঁজলো জ্বালাও-পোড়াও-ধ্বংসযজ্ঞ করে।

দিন-রাত বিরামহীন ওয়াজ মাহফিল, আবার শান-শওকতের সাথে দুর্গাপূজা সব অর্জন, গৌরব ও অহংকারের বিষয়গুলি এক নিমেষেই স্তব্ধ। নদী-মাতৃক বাংলাদেশের মধ্য-পূর্বা লের ঐতিহ্যবাহী তিতাস-বিধৌত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। শিল্প-সংস্কৃতি, শিক্ষা-সাহিত্যে দেশের অন্যতম অগ্রণী জনপদ।

শিল্প সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এবং দলমত নির্বিশেষে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল মিলন মেলা হিসেবে এ দেশের মানচিত্রে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। বাংলাদেশে খুব কম শহরই তাদের হিন্দু-মুসলমান মেলামেশাজনিত প্রি-সেক্যুলার সাংস্কৃতিক পরিচয়কে এভাবে ধরে রাখতে পেরেছে। নিরবধি বয়ে চলা নদী তিতাসের পাড়ে গড়ে উঠা জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুর-সভ্যতাও এখন বিলীন ঊষর প্রান্তর। চিরায়ত ধ্রুবপদ সঙ্গীতের ঘরানার বেদিমূলে বিস্তার নিয়েছে অসুর আর সংস্কৃতি সেবার আড়ালে স্বার্থান্বেষীদের স্বার্থসিদ্ধি!

সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে যদি বিদ্যমান রাজনীতির সমালোচনা করবার সুযোগ কমে যায়, তবে সেও তার গুরুত্ব হারায়। দলবাজির প্রশ্নহীন অসহায় ভোক্তা এবং বার্তাবাহকে পরিণত হয় সেই সংস্কৃতি। এককালে দেশের সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে পরিচিত শহরটিতে আবার সংস্কৃতিবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়ে উঠছিল। অজুহাত খোঁজা হচ্ছিল এমন একটি ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর। আগেও অন্তত চারবার এমন কান্ড ঘটিয়েছিল এই মৌলবাদী চক্র, সেই ঘটনা ১৯৯৮ ও ২০০১, ২০১৬, ২০১৭ সর্বশেষ ২০২১ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে অঙ্গারÑস্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সারা দেহে আজ শুধুই পোড়া গন্ধ।

এই যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আজ জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া এক ভ‚তুড়ে শহরে পরিণত হলো তার অনেকগুলো কারণের মূল কারণ মোটা দাগে রাজনৈতিক। কারোর ক্ষমতায় থাকার, কারোর ক্ষমতায় যাওয়ার! এই সুবিধাবাদের রাজনীতিই আমাদেরকে আজ এই ধ্বংসস্তূপে এনে দাঁড় করিয়েছে। মৌলবাদীদের উন্মত্ত আস্ফালন তো নতুন কিছু নয়। ২০১৩, ’১৬, ’১৭ সাল বাদ দিলেও আরো অনেকবার ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী তা অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রত্যক্ষ করেছে। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানো সেসব আক্রমণে তাদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস পড়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর। নিকট অতীতে সুরের জগতের সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গনকে তারা ভেঙেচুরে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল।

এবার পরিসর বেড়েছে শুধু সঙ্গীতাঙ্গনেই তারা সীমাবদ্ধ থাকেনি, সঙ্গীতাঙ্গনের পাশাপাশি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তন, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বর, মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স,আনন্দময়ী কালি বাড়ি, পৌরসভা কার্যালয়, জেলা পরিষদ, গণগ্রন্থাগার, ভ‚মি অফিস, পাউবি, থানা ভবন, এসপি অফিস, পুলিশ লাইন, গ্যাসফিল্ড সহ আরো অনেক স্থাপনাকে আক্রমণের আওতায় এনে একেবারে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিয়েছে। শুরুটা হয়েছিল ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেল স্টেশন ও বঙ্গবন্ধু চত্বরে আক্রমণের মধ্যে দিয়ে।

আমাদের গৌরবময় মহান মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী যখন গোটা দেশব্যাপী উচ্ছাস-আনন্দে উদযাপন করছিল ঠিক তখনই ধর্মান্ধগোষ্ঠী আনন্দ খুঁজলো জ্বালাও-পোড়াও-ধ্বংসযজ্ঞ করে। সম্পদহানীর এই যে ক্ষয়ক্ষতি এক ভুমি অফিস বাদ দিলে বাকী ক্ষয়ক্ষতি হয়তো পোষানো যাবে কিন্তু যে ক্ষতি কখনোই পোষানোর নয় তা হলো একসঙ্গে এতগুলো তাজা প্রাণের ঝরে যাওয়া, যুগ যুগ ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ধারণ করা সুরের সাধকের শেষ চিহ্নটুকুর একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া!

কোনো অসুখ নয়, বিসুখ নয় সুস্থ-সবল-সপ্রাণ দেহগুলো যে এমন নিথর-নিস্প্রাণ হয়ে গেল তা নিশ্চয়ই তথাকথিত ধর্মীয়গুরুদের অধর্ম আচরণে, রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার স্বীয় অভিলাষ চরিতার্থে সেসব গুরুদের হুকুমের বলী হয়ে। যার গেছে সে জানে কীসে সান্তনা খুঁজবে তাঁরা?

নিহতদের বাবা-মা আত্মীয় আপনজনদের কান্না, হাহাকার কি তাদের পীড়িত করে? জাগতিক কোনোকিছুর বিনিময়েই কি তা পূরণ করা সম্ভব?

নেতাদের রাজনৈতিক খায়েশ থাকে তো সেটা পূরণ করুক অন্যভাবে, ধর্মকে পুঁজি করে কেন? ভোটের সময় এলেই সবার গোমর ফাঁস হয়ে যায় তা তো সাধারণ জনগণ জানেই! সাধারণের ধর্মীয় অনুভ‚তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এ হীন কাজ কেন করে চলেছেন বারংবার? কেন কোমলপ্রাণ শিশুকিশোরদের ধর্ম রক্ষার দোহাই দিয়ে, ভুল বুঝিয়ে এই অনিশ্চিত যাত্রায় ঠেলে দেয়া প্রশ্নগুলো মনের মাঝেই ঘুরপাক খায়, আবার নতুন কোন ইস্যু এলে পূর্বের মতোই বাতাসে হারিয়ে যায়। তবে প্রশ্ন যাই থাক যে ক্ষতি হয়ে গেলো তা যে কত বড় লজ্জার, অপমানের তা কেউ বুঝতে চায় না, চেষ্টাও করে না!

বাংলাদেশ বিরোধী বিভিন্ন কর্মকান্ড বক্তব্যের অভিযোগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আসার প্রতিবাদ করার অধিকার বাংলাদেশের নাগরিকদের রয়েছে। এই প্রতিবাদ করতে গিয়ে গত কয়েক দিনে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ যেভাবে পুলিশ ও ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তা উদ্বেগজনক।

এই আগুনে সবার বুকে জ্বলে, সত্যিই জ্বলে। আগুনে জ্বলা রেল-স্টেশন, ঐতিহ্যমন্ডিত দ্য আলাউদ্দীন সঙ্গীতায়ন এর দিকে ভালো করে যদি দেখেন, তাহলে আগুন আপনি, আমি দেশের আপামর জনসাধারণের বুকেও জ্বলবে! দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থের যোগান দিয়েছে এই দেশের আপাময় জনগণ। এই দেশের মজবুত অর্থনীতি ও উন্নয়ন কারো বাপ দাদার পৈত্রিক সম্পদে গড়া নয়। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদরা একটি পয়সাও এই দেশের কোষাগারে জমা করেনি, শরীরের ঘাম ঝরিয়ে একটি পয়সাও রোজগার করে দেয়নি এই দেশে।

এই দেশের কোন আমলা কামলা, কোন বড় কর্তাবাবু এই অর্থের যোগান দেয়নি। তারা শুধু দেশের অসহায় মানুষের ঘাম ঝরানো অর্থে এয়ারকন্ডিশনিং রুমে শীতল বাতাসের নীচে বসে আরাম আয়েশ করেছে। আর যিনি যেই দিক দিয়ে পেরেছে দেশকে লুটেছে। অথচ দেশের এই অবকাঠামোগুলো যখন ধর্মের নামে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় তখন নিরাপত্তা রক্ষা পাওয়া যায় না প্রশাসনকেও।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কেন প্রশাসনিক নিরাপত্তার অভাব ছিল? আমারা সাধারণ মানুষ আঁচ করতে পেরেছিলাম যে উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে নাশকতা করার জন্যে, এসব কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারেননি? কেন আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? রাজনীতিবিদরা ক্ষমতার হালুয়া রুটি খাবেন আর সাধারণ মানুষের সম্পদ পরিবার হুমকির মুখে পড়বে? কেন হরতালের আগে পদক্ষেপ নেয়া হলো না। ডিসি, এসপি সাহেবরা কি করেছেন? তাদের গোয়েন্দারা কি বসে বসে আঙ্গুল চুষেছিল? আজ যখন দেখি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সকল কৃষ্টি ধ্বংস করে প্রাণের ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে যুদ্ধবিদ্ধস্ত আফগানে পরিণত করেছে তখন মনে হয় ’৭১ সালের সব অর্জন বৃথাই গেল!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকম ন‍্যাক্কারজনক ঘটনা কখনো ঘটেনি বলেই আমার মনে হয়। ইসলাম কি কখনো বলেছে জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করতে? দেশের জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে কেউ কেউ, তাদের ধিক্কার জানানোর ভাষাও আজ জানা নেই! ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতী সন্তানদের আজ আক্ষেপ ভরা কণ্ঠে বলতে ইচ্ছে করছে অশক্ত মেরুদন্ডে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখুন, এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে কীভাবে আপনাদের স্বপ্ন আর দূরদৃষ্টিকে বাংলার মাটি থেকে চিরতরে মুছে দিলো। হে নিঃসঙ্গ সুরের সম্রাট, চোখ খুলে দেখুন, অন্ধকার কেটে গিয়ে আপনার আলয়ে আজ নতুন সূর্য ঝলমল করছে না। বুকভরা দীর্ঘশ্বাস আর অভিমান মুছে ঝাপসা চোখে দেখুন আপনার জন্মভ‚মিতে অসুরের তান্ডবলীলা কতটা ভয়ংকর, আপনাদের স্মৃতি রক্ষার্থে আজ আর স্বপ্নপূরণের ব্যাটন নিয়ে কেউ ছুটে বেড়াবে না এখানকার মাঠ-ঘাট, অলিতে গলিতে। হেরে যেতে পারে না একটা ঋজু শরীরের স্বপ্ন ছোঁয়ার আকুল আকুতি যে আকুতি আজ ব্রাক্ষহ্মবাড়িয়ার মানুষের চোখের জল আর হাহাকার হয়ে স্পন্দিত হচ্ছে ঘরে ঘরে। আপনারা হেরে যাননি, আজ হেরে গেছে ইতিহাস!

ইতিহাস আর ঐতিহ্যের গর্বিত স্মৃতি চিহ্নগুলো সন্তানের মতো আগলে রাখার বিষয়। এই নিরীহ স্মৃতি চিহ্নগুলো তো কারো প্রতিপক্ষ নয়, অথচ কারণে অকারণে এগুলোই আক্রান্ত হচ্ছে। ইসলামের সূচনা পর্বে মুসলিম অধিকৃত জ্ঞান বিজ্ঞানের তীর্থ কেন্দ্র কর্ডোভার রাস্তায় যখন বাতি জ্বলত, তখন লন্ডন ছিল অন্ধকারময় গ্রাম। শিক্ষা, জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্যের এই প্রগতিশীল অবস্থান থেকে সরে গিয়ে মুসলমানরা যখন ওহাবী পথে হাঁটতে শুরু করল, ইসলাম ক্রমশই জ্ঞান বিজ্ঞানের পথ থেকে দূরে সরে যেতে থাকল আর উগ্রতা ভর করল।

কেন জানি বারবার মনে হচ্ছে পাকিস্তান আর তালেবান প্রেতাত্মা আমাদের ঐতিহ্যের উপর, আমাদের সংস্কৃতির উপর দানব হিসেবে ভর করে আছে। সেই প্রেতাত্মাই ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতিকে আমাদের ঐতিহ্যকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সম্প্রীতি ঘটে যাওয়া বীভৎসতা মনের ভিতর লুকিয়ে থাকা সেই আতংককে আরো অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে।

সাপের মুখে চুমু খাওয়ার খেলা দেখতে উত্তেজনা বোধ করার সুযোগ থাকলেও তার খেলোয়াড়ের পরিণতি শেষ পর্যন্ত করুণভাবেই শেষ হয়। রাজনীতিতে সেরকম খেলার দর্শক হয়েছে এদেশের জনগণ বারংবার। ধর্মীয় জঙ্গিবাদের সাথে সহবাস করলে এর মাশুল দিতে হয় চড়াদামে, ইতিহাসের এটা প্রমাণিত সত্য। যাদের মনোরঞ্জনের জন্য পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন করা হলো, কওমী সনদের স্বীকৃতি, রেলের জমি উপঢৌকন দেওয়া হলো, দ্রুত চিকিৎসা আর ওয়াজ মাহফিলে যোগদানের জন্য হেলিকপ্টার দেওয়া হলো, তারাই আজ ঘরের শত্রু বীভিষণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

পশ্চিম বাংলার ভোটের রাজনীতি এই দাঙ্গার সুফল ঘরে তুলতে কতটা পারবে জানি না, তবে প্রভুত সাহায্য করবে নিশ্চিত। অস্বাভাবিক রাতের ভোটে জিতে, দেশ চালনার লাইসেন্স দেয়ার মালিকদের উপকার করতে যেয়ে যে নোংরা খেলায় হাত দিলেন তার শেষটা সাপের মুখে চুমু খাওয়া খেলার পরিণতির চেয়েও ভয়ঙ্কর রূপে ফিরে আসবে সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্বাধীনতার পর স্বাধীনতার মাসে এমন তান্ডব আর নৈরাজ্য নতুন করে পেছন ফিরে তাকানোর তাগিদ দিয়েছে। ভোটের রাজনীতির ছক কষে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে রাজনীতিতে নিজেদের লাভালাভের হিসাব কষতে গিয়ে ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত শুধু নিজেদেরই হয়নি; গোটা দেশ ও সমাজেরই হয়ে গেল। এই ক্ষতি ও ক্ষত এত সহজে সারানো যাবে কিনা- এটি নিঃসন্দেহে বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে এই প্রশ্নটা এখন আর উপেক্ষার অবকাশ নেই যে, এর শেষ কোথায়? কারণ, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-মূল্যবোধ-অঙ্গীকার-প্রত্যয়বিরোধী যে উন্মাদনা দেশ-সমাজে তাদের কারণে নতুন করে কিছু বিষয় উত্থাপন করল; সেসবই দুশ্চিন্তার কারণ। এ কারণগুলো আমলে নিতেই হবে।

বিগত ৯-১০ বছরে তাদের সঙ্গে সরকার দফায় দফায় যে সমঝোতা করেছে, এর মধ্য দিয়ে তারা শক্তি স য় করেছে। সেসব পুঁজি করেই এখন আরও শক্তি স য় করতে চাইছে। দেশে এখন রাজনীতি কার্যত স্থবির। শক্তিশালী বিরোধী দল নেই। হেফাজত এখন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে চাচ্ছে। হয়তো এভাবেই ভবিষ্যতে হেফাজত এক সময় বিভক্তি গুছিয়ে একটি সংঘবদ্ধ ধর্মীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে নতুনভাবে অন্য চেহারায় আবিভর্‚ত হবে। তাতে সামগ্রিকভাবে আরও ক্ষতি হবে রাজনীতি, সমাজ ও দেশের। ক্ষতি হবে প্রগতির ও মানবিক মূল্যবোধের।

আরও বেশি করে আক্রান্ত হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।

রাষ্ট্র কেন এই দুরাচারদের এমন নিরবে সহ্য করছে অল্প বুদ্ধিতে বুঝতে পারি না। প্রশাসন কেন সহায়তা করছে এই হামলাবাজদের, এই দাঙ্গাবাজদের? রাষ্ট্রের আইন কেন এমন এক চোখা বুঝি না। এই যে ধর্মকে ব্যবহার করে একের পর এক মহাসমাবেশ, মহা ওয়াজ মাহফিল চলছে; এখন করোনা আতঙ্ক কোথায়? পুলিশের অনুমতি পায় কী করে এরা।

পুলিশের দরজায় ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলা খসে যায়। তাহলে এ বাংলাদেশ কার? বাংলার আউল বাউলরা দেশ ছাড়বে মামুনুলদের মতো সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যে আর দেশটায় রাজত্ব করবে মামুনুল হকদের মত সাম্প্রদায়িক মাস্তানরা? এই কি সুজলা সুফলা সোনার বাংলা? এই কি স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের সুবর্ণ অর্জন? অন্ধকার গ্রাস করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে, কেউ কি নেই আলো হাতে এগিয়ে আসবার? মশাল হাতে কেউ না এলে অচিরেই আঁধার অধ্যুষিত জনপদের তালিকায় প্রথম স্থান করে নেবে এ জেলা। যদিও এ আঁধার নতুন নয়। আমরা আঁধারে ডুবে থাকি বলে আঁধার দেখি না। গিরগিটি হয়ে পথ চলি কেবল! কী করে একটা আলোকিত জনপদ আঁধারে ডুবে যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে দেখে কি অন্য জনপদের মানুষ শিক্ষা নেবে না কি তারাও একই পথে যাবে সেটা দেখার বিষয়!

অতীত ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, আমাদের দেশে তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় হয় মারদাঙ্গাময়। খুনোখুনিও ঘটায় বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই। ধর্ম হয় না বর্ম তখন। ধর্মান্ধতা ঝাঁপিয়ে পড়ে ছুঁতোনাতাকে হাতিয়ার বানিয়ে। খোলা জানালাতলে দাঁড়ানো নিরীহ হৃদয় কেঁদে মরে হলেও কোনও হিতকর ঘটে না কিছু। বিবেকবান প্রতিবাদে মুখর হলেও আসে না সমাধান। সহজ শ্যামল বাতাস মুহূর্তে বিষিয়ে ওঠে গলগলে বিষাদচিত্র। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তান্ডবের ঘটনা ঠিক এমনিভাবেই এখানকার ঐতিহ্যগত বহুজাতিক সংস্কৃতির পরিবেশকে দূষিত করে দিয়ে গেল। এই ঘটনা শুধু সরকারের বিরুদ্ধে কিছু মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বার্তাই দিয়ে যায় নাই। আরো কিছু দিয়েছে। আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গন শহরে একটা শক্তিশালী সাংস্কৃতিক এজেন্সি।

আমরা বাঙ্গালীরা কখনই কোন অসুরের কাছে মাথা নত করিনি তারপরও বারবার নানা আজুহাতে ধর্মান্ধ মৌলবাদের অসুর এসে আক্রমণ চালায় আমাদের ঐতিহ্যের উপর, আমাদের সংস্কৃতির উপর। ঝরে যাওয়া জীবনগুলো যেমন আর ফিরে আসবে না এমনই ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও সঙ্গীতাঙ্গনের তার স্মৃতিবিজড়িত স্মৃতিচিহ্নগুলোও আর কখনোই ফিরে আসবে না। সভ্যতার এ যুগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো এমন নারকীয় অমানবিক ঘটনা কখনোই আমাদের দেশে ঘটুক সুস্থ্য জাতি হিসেবে এটা আমাদের আর কাম্য নয়।

উন্নতি হচ্ছে, জিডিপির চিত্র ষ্ফীত হচ্ছে- এসব নিয়ে আত্মতুষ্টিতে না ভুগে গভীর দৃষ্টি দেওয়া উচিত ধর্মান্ধতা-উগ্রতার বিষবাষ্প সমাজদেহে কীভাবে, কী কারণে, কী উদ্বেগজনকভাবে কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে এবং এর নিরসন কীভাবে দ্রæত করা যায় সেদিকে।

মানব মর্যাদা, নাগরিক অধিকার, বৈষম্যহীন সমাজ; এসবই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার। বাহাত্তরের সংবিধানের মূল স্তম্ভের ওপর আঘাত তো আরও আগেই এসেছে রাজনৈতিক হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে। এখন তো মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দলের নেতৃত্বাধীন সরকার দ্বারা দেশ চলছে। তাহলে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে বাধা কোথায়? ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে বাধা কোথায়? এই দুঃসহ অবস্থা ও ব্যবস্থা কি চলতেই থাকবে? সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কি ছড়াতেই থাকবে?

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁওয়ের ক্ষত, বীভৎসতা ফের যে বাস্তবতা তুলে ধরল, তা-ই কি নিয়তি বলে মেনে নিতে হবে? এর আগে রামু, নাসিরনগর, সাঁথিয়া কিংবা আরও বিভিন্ন স্থানে একই কায়দায় যেসব ঘটনা ঘটল, সেসবের বিচারের খবর কী? কোনোটির ক্ষেত্রেই তো জবাব প্রীতিকর নয়। না, অবশ্যই না। এই উন্মত্ততা, এই অরাজকতা বাংলাদেশের নিয়তি হতে পারে না।

সভ্যতা অপেক্ষা করছে একটি নতুন মোড় নেওয়ার। সে পৌঁছাতে চায় এমন একটি ব্যবস্থায়, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা শোষণমূলক হবে না; হবে মৈত্রীর। মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ যদি বিরাজ না করে সেখানে যে কোনো অপশক্তিই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক স্বার্থে, রাজনৈতিকভাবে হেফাজতিদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, হেফাজত করে যে বৈরী পথ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে; সেই পথেই তারা হাঁটছে। গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি, সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলোকে যূথবদ্ধ হতে হবে। অন্ধকারের শক্তি হটাতে এর কোনো বিকল্প নেই। তবে যারা স্ববিরোধিতার মোড়কবদ্ধ, তাদেরও তা থেকে আগে মুক্ত হতে হবে। সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের আশঙ্কা থেকে এক অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছে। সব অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর ও নির্মোহ হতে হবে সরকারকে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গর্বিত সন্তান হিসেবে অন্য দশজনের মত আমিও চাই, আগের চেয়ে আরো সুন্দর, আরো উন্নত হোক ব্রাহ্মণবাড়িয়া। শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে ধারণ করুক; কলুষতামুক্ত রাজনীতির চর্চা হোক; বিরাজ করুক শান্তির সুরধারা। ফিরে পেতে চাই মানবিক স¤প্রীতির সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া। হিন্দু-মুসলিম সৌহার্দ্যরে যে পবিত্র ভূমি থেকে সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন কল্যাণের সুর; সেই সুরধারায় নতুন করে সিক্ত হোক প্রাণের জনপদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সরকারের কাছে ব্যক্তিগত আর্জি হচ্ছে এবারের এই পোড়া স্থাপনাগুলো অবিকল রেখে দিয়ে অন্যত্রে অবকাঠামো নির্মাণ করা হোক। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই পোড়া ক্ষতগুলো দেখবে আর লজ্জায়, ঘৃণায় থুথু ফেলবে তাদের প্রতি যারা এই অপকর্মে নেতৃত্ব দিয়েছে, অংশগ্রহণ করেছে ও এ সবের নেপথ্য নায়কদেরও চিনে নিবে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করছি অথচ এখনো মুক্তিযুদ্ধে দেখা স্বপ্ন অসা¤প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। যদিও কাগজে কলমে, পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ শাইন ফিল গুড বিজ্ঞাপন ফেরি করে বেড়াচ্ছে কতিপয় উন্নয়নের হকার। অথচ জাতিগত নিমজ্জনের অশনি সংকেত শুনি তিতাস বিধৌত জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িযার সর্বত্র। ক্ষমতাসীন সরকারের দীর্ঘ সময় নিরংকুশ ক্ষমতায় কেটে যাওয়ার পরেও যদি কোন ঘটনায় ষড়যন্ত্রের আকাশকুসুম গল্প শুনতে হয়, দেশপ্রেমের আলংকারিক শব্দের ডিকশনারিতে লুকাতে হয় এইসব ব্যর্থ দিবারাত্রির কাব্য তাহলে বোধ করি ইতিহাসও আমাদের ক্ষমা করবে না। তারপরেও যদি কোন সময়ে এই অদৃশ্য অপরাধের আবদ্ধ প্রাচীর ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারি, সীমাবদ্ধতার প্রাচীরকে দূরে সরিয়ে শুধু নির্লজ্জের নত মস্তকে মৃত্তিকার দিকে না ধেয়ে একবারের জন্য প্রতিবাদে সরব হয়ে উঠতে পারি তবেই শান্তি পাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিদগ্ধজনের আত্মা, পোড়া দেহেও কিছুটা শীতলতা আসবে।

তথ্যসূত্র: প্রত্যক্ষদর্শী, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

 

 

Facebook Comments Box

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১